Total Pageviews

Friday, October 28, 2011

ভাতের মাড় বা ফ্যানের বহু গুণ

অতি সহজলভ্য খরচবিহীন এই ভাতের মাড়কে আমরা নিম্নমানের জিনিস বিবেচনা করে ফেলে দেই। এটা ক্যালোরিসমৃদ্ধ সুষম খাবার বলে বিবেচনা করা যায়। ভাতের বাড় হলো চালের নির্যাস। এই নির্যাস ফেলে দিলে ভাতের কিছু থাকে না। তাই ভাতের মাড় ফেলে না দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখা দরকার খাবারে ক্যালসিয়াম বেড়ে গেলে তা ফসফরাস শোষন ক্ষমতা-হ্রাস করে। আবার অধিক ফসফরাস সমৃদ্ধ খাদ্য ক্যালসিয়াম শোষনে বাধা দেয়। এতে ক্যালসিয়াম ঘাটতি হতে বাধ্য। তাই ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের ভারসাম্য রক্ষা করতে ভাতের মাড় অদ্বিতীয়। ভাতের মাড় ক্যান্সার প্রতিরোধক। এতে রয়েছে প্রোটিন, আঁশ ও ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স। ভাতের মাড় কোষ্টকাঠিন্য দূর করে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়, শুধু তা-ই নয়, যাদের উচ্চ রক্সচাপ আছে তারা মাড় না ফেলে জাউ রান্না করে খাবেন। এতে প্রচুর পরিমাণ পটাসিয়াম থাকায় উচ্চ রক্তচাপ কমায়। ভাতের মাড়ে অধিক পরিমাণে গ্লুকোজ আছে বিধায় রক্তে যথেষ্ট শর্করা সরবরাহ করে। ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। যাদের বিভিন্ন প্রকারের আলসার হওয়ার প্রবনতাথাকে তারা নিয়মিত ভাতের মাড়ে সামান্য লবন দিয়ে চামচে তুলে স্যুপের মতো খেলে এই প্রবণতা থাকে না।
ভিটামিন ই নিয়ে এখন উন্নত বিশ্বে যথেষ্ট গবেষনা হচ্ছে। ভাতের মাড়ে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ই রয়েছে, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এতে আরো রয়েছে টোকোট্রাইনোল যা অত্যন্ত কার্য়কর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ভাতের মাড়ের মধ্যে আরো একটি প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে, যাকে বলে Oryza Sative Linn । এতে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও স্টেরয়েড। প্রাকৃতিক স্টেরয়েড আমাদের দেহের মাংসপেশিকে শক্তিশালী করে। এখন বাজারে এই স্টেরয়েড বড়ি পাওয়া যায়। খেলোয়ার ও ক্রীড়াবিদরা তাদের মাংসপেশীকে শক্তিশালী ও অধিক কার্যক্ষম করতে এই বড়ি নিয়ে থাকেন। তবে এ বড়িতে কারো কারো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিন্তু ভাতের মাড় খেলে কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় না।
চীন ও জাপানে ভাতের মাড় নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। ২০০৪ সালে চীনের বিজ্ঞানী মি. লিন মাড় ফেলা ও মাড় বিদ্যমান ভাত নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি গবেষণায় ভাতের মাড়ে জিংক, মেলেনিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও কপার এই ছয়টি উপাদান আবিস্কার করেছেন। ফেলে দেয়া ভাতের মাড়ে তিনি মেলেনিয়াম ২ গুণ, জিংক ৩, আয়রন ১০, ক্যালসিয়াম ৪, ম্যাঙ্গানিজ ১২ এবং কপার ৬ গুন পেয়েছেন। আরো কয়েকটি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ভাতের মাড়ের অরাইজামোল মানবদেহের ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল হ্রাস করে এবং HDL অপরিবর্তিত রাখে।
জাপানে মেয়েরা ভাতের মাড় রূপচর্চায় ব্যবহার করে। মুখের ত্বকে ভাতের মাড় লাগালে ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় বলে তরা এটা ব্যবহার করে। একটি বিদেশী পত্রিকা বলছে, তারা এক সমীক্ষায় দেখেছে ভাতের মাড় মানবদেহের মেলানিন ছড়িয়ে পড়তে দেয় না। মেলানিনের কারণে মানুষ ফর্সা, কালো বা শ্যামলা হয়। সূর্যের আলট্রাভায়োলেট রশ্মি দেহে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। আসুন, আমরা ভাতের মাড় ফেলা বন্ধ করে মাড় শুকানো ভাত খাই এবং সুস্থ থাকি। 

Friday, October 14, 2011

যত বেশি ঘাম, তত বেশি সুস্থতা

ঘাম সবার জন্যই একটি বিরক্তিকর বিষয়। আবার অনেক সময় ঘামের মাধ্যমে কোঝা যায় আপনি কতটা পরিশ্রম করেছেন, কতটা ক্লান্ত। এর বেশি কখনোই হয়ত ঘাম নিয়ে এতটা ভাবা হয়নি। কিন্তু ঘাম নিয়েও আছে নানান অবাক করার তথ্য। ঘামের ধরন, উপকারিতা, উৎস সহ আরো অনেক মজার তথ্য জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার এক দল গবেষক।
ভিন্নতা আছে নারী-পুরুষের ঘামানোর মধ্যে
নারী-পুরুষ পুরোপুরি ভিন্ন। তাদের দেহ গড়ন ভিন্ন, তাদের মানসিকতা ভিন্ন, তাদের খাদ্যাভাস থেকে শুরু করে ঘামানোর মাত্রাটা পর্যন্ত ভিন্ন।
গবেষকরা দেখেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং সমবয়সী একজন নারী একই পরিমাণ কাজ, একই সময় ধরে করছে এবং পরিশ্রম একই পরিমাণ করেছে। কিন্তু তাদের তাদের ঘামানোর মাত্র ছিল ভিন্ন। সেই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তার সমবয়সী নারীর তুলনায় চারগুণ বেশি ঘাম ঝড়িয়েছে। এই ভিন্নতার পেছনে হরমোন দায়ী বলে মনে করছেন গবেষকরা। তবে তারা এখনো এর নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাদের এই গবেষণার প্রতিবেদনটি কিছুদিন আগে ‘এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিওলজি’ নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।
বেশি ঘাম, মানে সুস্থতা
অনেকেরই ধারণা, বেশি ঘামানো মানে অসুস্থতার লক্ষণ লক্ষণ। কিন্তু এই ধারণাটিকে ভুল বলে উড়িয়ে দিলেন গবেষকরা। তারা জানিয়েছেন, ঘাম বেশি হওয়া মানে হলো আপনি পুরোপুরি ফিট আছেন। যত বেশি ঘাম, তত বেশি সুস্থতা।
এর কারণ হিসেবে গবেষকার বলেছেন, বেশি ঘামানোর মানে হলো আপনি বেশি কাজ করছেন। এর মানে হলো আপনার দেহ যারা কম ঘামায় তাদের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। আর তাই দেহের ভেতরে জমে থাকা পানি ঘামের মাধ্যমে বের হয়ে শরীরকে ঠাণ্ডা করে। এর মাধ্যমে পরিশ্রমের ফলে শরীরের তাপমাত্র বেরে গেলে, ঘাম তা নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমাদের ফিট রাখে।
পূর্বসূরিদের প্রভাবও আছে ঘামে
আপনি যদি স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি ঘামান, তাহলে এতে আপনার কোনো হাত নেই। এর জন্য দায়ী আপনার বংশ।
কারণ, গবেষকদের মতে জন্মগতভাবেই মেজর হিস্টোকম্পাটিবেলিটি নামের একটি অনু ঘামানোর মাত্রা এবং ঘাম সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর এই অনুটি আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাই আমাদের মা-বাবার কাছ থেকে।
অতিরিক্ত ঘাম
আমরা সাধারণত ঘামাই যখন আবহাওয়া অনেক উত্তপ্ত থাকে, অনেক পরিশ্রমের পর, ভয় পেলে অথবা ভারি কোনো কাপড় পরলে। কিন্তু অনেকেই আছে ওপরের কারণগুলো ছাড়াও অহেতুকই ঘামায়। দেখা যায় ঠাণ্ডা কোনো কক্ষে বসে থাকার পর ঘামছে কারো হাত, পা, মুখ বা বগল।
যদি এমনটা আপনার সঙ্গেও হয়, তাহলে বুঝতে হবে এটা একটা রোগ। চিকিৎসকদের ভাষায় একে বলে হাইপারহাইড্রোসিস। এই রোগে অধিকাংশ সময়েই মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই ঘামায়। বিশেষ করে হাতের তালু, পায়ের তলা, বগেএবং মুখমন্ডলে অতিরিক্ত এই ঘামের উৎপত্তি হয়। যা অনেকের জন্যই অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে এবং ভবিষ্যতে বড় কোনো রোগ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। কারণ সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা করা না হলে এক সময় এই ঘামানোর রোগ পারকিনসনস এবং ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রূপও ধারণ করতে পারে।
ঘাম দুই ধরনের
ঘামেরও আছে ধরন। আমাদের দেহে দুই ধরনের ঘামের উৎপত্তি হয়ে থাকে। একটি হলো একরিন সোয়েট গ্ল্যান্ড, অপরটি অ্যাপোক্রিন সোয়েট গ্ল্যান্ড।
একদিন সোয়েট সোয়েট গ্ল্যান্ড হলো সাধারণ ঘাম, যা শরীর থেকে জমে থাকা পানি গুলো বের করে দেয়। একটানা কাজ বা ব্যায়াম করলে এই ঘাম শরীর থেকে নিঃসরিত হয়।
অন্যদিকে অ্যাপোক্রিন সোয়েট গ্ল্যান্ড হলো, লোমকুপ থেকে যে ঘম নিঃসরিত হয় তা। অর্থাৎ অতিরিক্ত গরমে অথবা দুশ্চিন্তা আমাদের মাথার ত্বক বা বগল ঘামলে যে ঘাম বের হয় তা হলো অ্যাপোক্রিন সোয়াট গ্ল্যান্ড।
বার্তা২৪ ডটনেট

সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর পেয়ারা

ফলের দোকানগুলোতে যে হারে দামি দামি বিদেশি ফল সাজানো থাকে, তাতে দেশি ফলের কদর নেই বলেই মনে হয়। অথচ দেশি অপেক্ষাকৃত সস্তা ফল পেয়ারাই মানবদেহের জন্য সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর। আর এ তালিকার সবচেয়ে নিচে রয়েছে আনারস। সম্প্রতি এক গবেষণা শেষে ভারতের হায়দরাবাদ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন-এর বিজ্ঞানীরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
ভারতের বাজারে পাওয়া ১৪টি তাজা ফলে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অঙ্েিডন্টের মাত্রা জানতে বিজ্ঞানীরা এ গবেষণা চালান। এতে দেখা যায়, আপেল, কলা, আনারস, পেঁপে, আম, জাম, কাঁঠাল প্রভৃতি ফলের চেয়ে পেয়ারা বেশি পুষ্টিগুণ ও অ্যান্টি-অঙ্েিডন্ট সমৃদ্ধ।
পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, মানবদেহে বেশির ভাগ রোগের কারণ অ্যান্টি-অঙ্েিডন্টের অভাব। ক্যান্সার, বার্ধক্যজনিত দৃষ্টিহীনতাসহ মারাত্মক সব রোগের উৎপত্তি হয় এর অভাবে।
অ্যান্টি-অঙ্েিডন্ট দেহে কোষের সুরক্ষা করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। তাঁরা জানান, মানবদেহে অ্যান্টি-অঙ্েিডন্ট ওষুধ আকারে প্রয়োগ না করে অ্যান্টি-অঙ্েিডন্ট সমৃদ্ধ পেয়ারা খেলে তা অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
গবেষকদলের প্রধান ডা. ডি শ্রীরামুলু জানান, যেখানে ১০০ গ্রাম আনারসে ২২ মিলিগ্রাম অ্যান্টি-অঙ্েিডন্ট পাওয়া যায়, সেখানে ১০০ গ্রাম পেয়ারায় অ্যান্টি-অঙ্েিডন্টের পরিমাণ ৪৯৬ মিলিগ্রাম। মানবদেহে অ্যান্টি-অঙ্েিডন্টের ঘাটতি পূরণে ফলের পুষ্টিগুণের ওপর গবেষণা চালাতে গিয়ে অনেক ফলের মধ্যে তাঁরা পেয়ারাতেই সবচেয়ে বেশি অ্যান্টি-অঙ্েিডন্ট খুঁজে পেয়েছেন। এ কারণেই রোগমুক্ত থেকে সুস্বাস্থ্য ধরে রাখার জন্য নিয়মিত পেয়ারা খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া।
কালের কন্ঠ

যকৃৎ প্রতিস্থাপন আর লাগবে না!

ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা নতুন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এ পদ্ধতিতে স্টেম সেল যকৃতে সক্রিয় কোষ তৈরি করবে। ফলে যকৃত্ প্রতিস্থাপনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও এর বিপুল ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। গত বুধবার একটি জার্নালে এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
স্যাংগার ইনস্টিটিউট ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে একদল গবেষক এ গবেষণা করেছেন। তাঁরা ত্বকের অংশ থেকে সংগৃহীত কোষকে বিশেষ পদ্ধতিতে পরিবর্তিত করে নতুন স্টেম সেল তৈরি করেছেন। এই স্টেম সেলই যকৃতে সক্রিয় কোষ তৈরিতে সাহায্য করে। গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর এ পরীক্ষা করে সফল হয়েছেন।
স্যাংগার ইনস্টিটিউটের পরিচালক অ্যালান ব্রাডলি বলেছেন, ‘রোগীর শরীরের ত্রুটিপূর্ণ জিনকে উদ্দেশ করেই এ পদ্ধতি তৈরি করার চেষ্টা করেছি। এটা আমাদের প্রথম ধাপ। কিন্তু যদি এ কৌশল পুরোপুরি চিকিত্সার জন্য নেওয়া হয় তাহলে রোগীদের জন্য আরও ভালো কিছু করার সম্ভাবনা আছে।’
শরীরের প্রধানতম কোষ হলো স্টেম সেল। আর এই স্টেম সেলই হচ্ছে শরীরের অন্য সব কোষের মূল উত্স। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর মাধ্যমে অন্ধত্ব, মেরুদণ্ডের সমস্যা ও অন্যান্য স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত কোষের চিকিত্সা সম্ভব হবে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাডভান্সড সেল টেকনোলজির রবার্ট লানজারের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল চামড়া বা রক্ত থেকে প্রাপ্ত স্টেম সেল (আইপিএস) এবং ভ্রূণ থেকে প্রাপ্ত স্টেম সেলের মধ্যে তুলনামূলক গবেষণা করে বলেছে, আইপিএস সেল খুব তাড়াতাড়ি মরে যায়। আর এটার বৃদ্ধিও খুব ধীরে হয়।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুডোভিক ভেলিয়ার বলেছেন, ‘প্রথম পদক্ষেপেই আমরা সেল থেরাপির মাধ্যমে যকৃতের সমস্যা সমাধান নিয়ে কাজ করেছি। এটাকে সফল করতে আমরা এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আছি।’
গবেষকেরা বলছেন, তাঁরা যদি এ ক্ষেত্রে সফল হন তাহলে লিভার প্রতিস্থাপন জটিলতা ও ব্যয়ভার এবং সারা বছর ওষুধ নেওয়ার ঝামেলা অনেক কমে যাবে।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক দলের সদস্য ডেভিড লোমাস বলেছেন, ‘আমরা যদি যকৃতে নতুন কোষ তৈরির জন্য রোগীর নিজের চামড়া কোষ থেকেই নিতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে যকৃত্ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা প্রতিরোধ করা যাবে।’ রয়টার্স। prothom-alo

'চকলেট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়'

যারা চকলেট বেশি খায় তাদের স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি কম বলে জানিয়েছে সুইজারল্যান্ডের একদল গবেষক। প্রায় ৩৩ হাজারেরও বেশি নারীর ওপর জরিপ চালিয়ে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন।

জার্নাল অব দি আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজিতে এ জরিপভিত্তিক এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।

হৃদপিন্ডের সুস্থতার সঙ্গে কোকোয়া গ্রহণের সম্পর্ক বিষয়ে আরো প্রমাণ জড়ো করেছে এ গবেষণাটি। তবে অধিক পরিমাণে চকলেট খাওয়ার ব্যাপারে অবাধ অনুমতি দেন নি গবেষকরা।

স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইন্সস্টিটিউটের সুজানা লারসন বলেন, চকলেট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়- এ গবেষণায় তা পুরোপুরি প্রমাণিত হয় নি। তবে স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে এর কিছু উপকারিতা রয়েছে বলে আমরা মনে করি।

অত্যাধিক চকলেট খাওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি জানিয়ে তিনি বলেন, চকলেটে চর্বি ও চিনি থাকায় এতে উচ্চ পরিমাণে ক্যালোরিও রয়েছে। তবে মিল্ক চকলেটের তুলনায় কোকোয়ার পরিমাণ বেশি এবং চিনি ও চর্বি কম থাকায়, ডার্ক চকলেট স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী হয়।

এ গবেষণাটিতে ১৯৯৭ সালে ৪৯ থেকে ৮৩ বছর বয়সী নারীদের চকলেট খাওয়ার হার বিষয়ক উপাত্ত ব্যবহার করা হয়। এর পরবর্তী দশকে ওই জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫৪৯টি স্ট্রোকের ঘটনা ঘটেছে। জরিপে দেখা গেছে, যারা তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে চকলেট খেয়েছেন তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ততোই কমেছে।

এদের মধ্যে যারা সপ্তাহে ৪৫ গ্রাম চকলেট গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে বছরে গড়ে প্রতি ১ হাজার জনের মধ্যে ২ দশমিক ৫টি স্ট্রোকের ঘটনা ঘটেছে। যারা সপ্তাহে ৮ দশমিক ৯ গ্রাম চকলেট গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে এ হার ছিলো প্রতি বছর ১ হাজার জনের মধ্যে ৭ দশমিক ৪টি।

গবেষকরা বলছেন, চকলেটের মধ্যে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড নামের উপাদান, যা ফ্ল্যাভোনইস নামেও পরিচিত, স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাবই বেশি।

লারসন বলেন, রক্তচাপ, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে এবং রক্তে হৃদপিন্ডের সুস্থতার জন্য দরকারী উপাদানগুলোর সঙ্গে ফ্ল্যাভোনয়েড সম্পর্কিত। তবে এ তথ্যটি এখানো ধারণার পর্যায়ে রয়েছে, এ বাস্তবতা সম্পর্কে আরো গভীর ও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/

বয়স্ক নারীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায় ভিটামিন

ভিটামিনের কথা উঠলে মনে হতে পারে বেশি বেশি ভিটামিন খাওয়া হয়তো ভালো। কিন্তু গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন অন্য ব্যাপার। বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে ভিটমিনের ব্যবহার মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায় বলে দাবি করছেন তারা।

যারা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে ভিটামিন শুধু তাদের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা এবং অতিরিক্তি ভিটামিন খাওয়া ক্ষতির কারণও হতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

সাধারণত পুষ্টিমান ঠিক থাকা সত্ত্বেও পঞ্চাশ ও ষাটের কোঠার অনেক নারীই ভিটামিন খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষত মাল্টিভিটামিন, ফলিক এসিড, ভিটামিন বি৬, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, কপার ও আয়রন মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।

গবেষকদের বিশ্বাস, ভিটামিন খেলে উপকার হবে এমন কোন প্রমাণ ছাড়াই ভোক্তারা ভিটামিন কিনে থাকে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ইস্টার্ন ফিনল্যান্ডের গবেষক ড. জাকো মুরসু ও তার সহকর্মীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ হাজার নারীর ওপর গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে যারা গত দু'দশকে ভিটামিন এবং মিনারেল গ্রহণ করেছেন।

এতে দেখা গেছে, অন্যান্য ভিটামিনের তুলনায় আয়রন ট্যাবলেট খেলে মৃত্যুঝুঁকি ২ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ে। তবে এটি নির্ভর করে ট্যাবলেটের ডোজের ওপর। বেশি ডোজের আয়রন ট্যাবলেটের ঝুঁকিও বেশি।

অন্যদিকে, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট মৃত্যুঝুঁকি কমায়। তবে এ বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে এবং ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অযথা ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়া উচিত না বলে পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

যুক্তরাষ্ট্রে স্থুলতার হার কমছে

যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের মুটিয়ে যাওয়ার হার সামান্য হলেও কমতে শুরু করেছে। বাড়ছে স্বাভাবিক ওজনের মানুষের সংখ্যা।

মাত্রাতিরিক্ত ওজন ও স্থূলকায় মার্কিনির সংখ্যা এখনো অনেক বেশি হলেও গত বছর স্বাভাবিক ওজনের মানুষের সংখ্যা সামান্য বেড়েছে- এমনটিই দেখা গেছে নতুন এক গবেষণায়।

গ্যালাপ-হেলথওয়জ ওয়েল-বিয়িং ইনডেক্স পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, চলতি বছর তৃতীয়ার্ধে স্বাভাবিক ওজনের মার্কিনির সংখ্যা ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ। আগের বছর এ হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

সংস্থাটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে মোটা মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি।

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এ সংখ্যা সামান্য হলেও কমতে শুরু করেছে। এক বছর আগে অতিরিক্ত ওজনধারী মার্কিনির সংখ্যা ৩৬ দশমিক শূন্য থেকে এ বছর কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৮ এ। আর মোটার হার গত বছরের ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, "বেশিরভাগ মার্কিনি এখনো অতিরিক্ত ওজনধারী কিংবা মোটা হলেও স্থূলতার হার কমে আসার এ লক্ষণ শুভ।"

গবেষণায় এর কারণ সুষ্পষ্টভাবে ব্যখ্যা করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই এই পরিবর্তন ঘটছে।

যুক্তরাষ্ট্রে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেকেই রেস্টুরেন্টে উচ্চমাত্রার ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার বদলে তুলনামূলক কম খরচে খাওয়া-দাওয়া করছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/

অতিরিক্ত টিভি দেখা, বাড়ায় ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

হাভার্ড স্কুল অফ পাবলিক হেল্থ’র (এইচএসপিএইচ) একদল গবেষক সম্প্রতি জানালেন, অতিরিক্ত টিভি দেখলে বাড়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। এর সঙ্গে আরো বাড়ে হৃদরোগ এবং অকাল মৃত্যুর আশঙ্কা।
সম্প্রতি গবেষকদের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে জার্নাল অফ আমেরিকান মেডিকাল অ্যাসোসিয়েশনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি টিভি দেখলেই বেড়ে যায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। আর যে ব্যক্তি তিন ঘণ্টার বেশি টিভি দেখে তার অকাল মৃত্যুর আশঙ্কা বেড়ে যায়।
এই প্রতিবেদনের প্রধান লেখক এবং এইচএসপিএইচ’র এপিডেমিওলজির প্রফেসর ফ্র্যাঙ্ক হু বলেছেন, “অকাল মৃত্যু এবং ডায়াবেটিসের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে টিভি কম দেখা এবং কায়িক পরিশ্রম।”
ফ্র্যাঙ্ক হু এবং তার দল ১৯৭০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টিভি এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও অকাল মৃত্যু নিয়ে প্রকাশিত যত ধরনের প্রতিবেদন আছে সব পর্যবেক্ষণ করেন। তারা আমেরিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার এই সংক্রান্ত যত ধরনের রিপোর্ট আছে সবগুলো আবার নতুন করে পর্যবেক্ষণ করেন।
পর্যবেক্ষণের পর গবেষকরা দেখতে পান, অধিকাংশ রিপোর্টেই সেই সব ব্যক্তিরা ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয় যারা কায়িক পরিশ্রম করে না। এবং যারা কায়িক পরিশ্রম বিমুখদের সবচেয়ে প্রিয় বিষয় হচ্ছে টিভি দেখা।
বার্তা২৪ ডটনেট

Tuesday, October 11, 2011

বিশেষজ্ঞের চেম্বার থেকে

পরামর্শ দিয়েছেন মো. গোলাম রব্বানী

মো. গোলাম রব্বানী মো. গোলাম রব্বানী
পরিচালক ও অধ্যাপক, জাতীয়মানসিক স্বাস্থ্যইনস্টিটিউট, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা
সমস্যা: আমার একমাত্র ছেলের বয়স ছয় বছর। অসম্ভব দুরন্ত। সারা দিন ছোটাছুটি করে। এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে না। কোনো অনুষ্ঠানে গেলে সব সময় দৌড়াদৌড়ি করে। বাসার কাজের লোক বা স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে। দুই বছর ধরে স্কুলে যায়, কিন্তু পড়ালেখায় মনোযোগ কম, রেজাল্টও খারাপ। স্কুলের শিক্ষক বলেন, ওকে মানসিক চিকিৎসক দেখাতে। কিন্তু ওর দাদা-দাদি রাজি হন না, তাঁরা বলেন, এটা স্বাভাবিক।
আসলে ওর সমস্যা কি মানসিক? বড় হয়ে গেলে কি ও ঠিক হবে? আমার কী করণীয়?
উম্মে কুলসুম, পূর্ব রাজাবাজার, ঢাকা
পরামর্শ: আপনার সন্তানের লক্ষণগুলো শুনে মনে হচ্ছে সে অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (অতিচঞ্চল শিশু) বলে এক ধরনের সমস্যায় ভুগছে। এটা এক ধরনের মানসিক সমস্যা, যা এই বয়সী শিশুদের হতে পারে। এ সমস্যার সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা আছে। উপযুক্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং আর সাইকোথেরাপির মাধ্যমে তাকে অনেকাংশেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
তবে যথার্থ চিকিৎসা না পেলে বড় হলে তার ব্যক্তিত্বের সমস্যাসহ আরও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঘাবড়ে না গিয়ে আপনি তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ‘শিশু বিকাশ ও চিকিৎসা কেন্দ্রে’র বহির্বিভাগে যেকোনো বুধবার সকাল ১০টার মধ্যে নিয়ে আসুন।

মানসিক স্বাস্থ্যের ভালো-মন্দ

মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, জেরিয়াট্রিক ও অর্গানিক সাইকিয়াট্রি বিভাগ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।

শরীরের ছোটবড় যেকোনো সমস্যায় আমরা ব্যাকুল হয়ে পড়ি, উপস্থিত হই হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে। কিন্তু এই রক্ত-মাংসে গড়া শরীর ছাড়াও আমাদের জীবনে যে মন বলে আরেকটি উপাদানের অস্তিত্ব আছে তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। মনকে বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য নয়। আর মনের স্বাস্থ্যই হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য। মানসিক স্বাস্থ্য, মনের রোগ, মানসিক সমস্যা ইত্যাদি কথা আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মানুষই সহজভাবে নিতে চায় না। আরেকটি অপব্যাখা হলো যে মানসিক সমস্যা মানেই অহেতুক উত্তেজিত হওয়া, ভাঙচুর, মারামারি করা, অপরকে আক্রমণ করা। বাস্তবে মানসিক রোগীদের খুব ক্ষুদ্র অংশই এ লক্ষণগুলো প্রকাশ করে। এর বাইরে বেশির ভাগ মানসিক রোগী রয়েছে যাদের লক্ষণগুলো লঘু হলেও তা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ তারা কিন্তু চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে চায় না। তারা মনেই করে না যে তাদের কোনো মানসিক সমস্যা আছে বা আদৌ এর জন্য চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
মূলত মানসিক সমস্যা দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি গুরুতর মানসিক সমস্যা (সাইকোটিক ডিসঅর্ডার), যেখানে রোগী তার নিজের রোগলক্ষণগুলো সম্পর্কে মোটেই সচেতন থাকে না, তার যে রোগ আছে তা কখনোই স্বীকার করে না। কিন্তু অন্যরা লক্ষ করে। তাদের চিন্তা, আচরণে চরম অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, কোনো যুক্তিতেই তাদের চিন্তা বা আচরণকে সমর্থন করা যায় না। এই গুরুতর মানসিক রোগের মধ্যে আছে সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, ডিল্যুশনাল ডিসঅর্ডার, মেজর ডিপ্রেশন (বিষণ্নতা) ইত্যাদি।
আরেক ধরনের মানসিক সমস্যা রয়েছে মৃদু মানসিক সমস্যা বা নিউরোটিক ডিসঅর্ডার, যেখানে রোগী নিজেই টের পায় যে তার মধ্যে কোনো ধরনের মানসিক সমস্যা আছে এবং এর থেকে তার পরিত্রাণ পাওয়া দরকার। যেমন অতি উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি), অহেতুক ভয় (ফোবিয়া), কনভার্সন ডিসঅর্ডার, সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার ইত্যাদি।
মানসিক রোগের সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো:

চিন্তার অস্বাভাবিকতা: যুক্তিযুক্ত চিন্তা করতে না পারা, অবাস্তব অলীক চিন্তা করা। চিন্তার খেই হারিয়ে ফেলা, এক চিন্তা থেকে দ্রুত সম্পর্কহীন বিষয়ে চিন্তা করা। মনে করা যে চিন্তা চুরি হয়ে যাচ্ছে বা রেডিও-টিভিতে চিন্তা ছড়িয়ে পড়ছে। চিন্তার মধ্যে অন্য কারও চিন্তা অনুপ্রবেশ করছে। চিন্তা ও কথার অসংলগ্নতা।

হ্যালুসিনেশন (অলীক প্রত্যক্ষণ): কোনো ধরনের উদ্দীপনার উপস্থিতি ছাড়াই তা প্রত্যক্ষণ করা। অর্থাৎ ঘরে কেউ নেই অথচ কানে কথা শোনা, সামনে কিছু নেই অথচ কিছু দেখা, গায়ে কিছুর স্পর্শ অনুভব করা।

অহেতুক সন্দেহ: কোনো কারণ ছাড়াই অন্যকে সন্দেহ করা। রোগী মনে করে অন্যরা তার ক্ষতি করতে চায়, তার খাবারে বিষ মেশাতে চায়, তাকে নিয়ে নানা বদনাম রটাতে চায় ইত্যাদি।

বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রিত হওয়া: মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করতে পারে যে তার চিন্তা, আচরণ কোনো কিছুই তার নিজের নয়, অন্য কেউ বা বাইরের কোনো শক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
নিজের সম্পর্কে অতি উঁচু ধারণা: নিজেকে অতিরিক্ত ক্ষমতাধর বলে ভাবা। নিজের ক্ষমতার অতিরিক্ত কোনো কিছু করার চেষ্টা করা। নিজেকে অসম্ভব বড় কোনো চরিত্রে কল্পনা করা।

নিজের সম্পর্কে তুচ্ছ ধারণা: সব সময় মনে করা যে সে খুবই তুচ্ছ। তাকে দিয়ে কিছু হবে না, সে জীবনের সব ক্ষেত্রেই পরাজিত। তীব্র হতাশা। নিজের সম্পর্কে সব সময় নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা।

ঘুমের সমস্যা: প্রায় সব ধরনের মানসিক সমস্যায় ঘুমের নানা রকম সমস্যা হয়। ঘুম আসে না, আবার কখনো ঘুমিয়ে গেলে ঘুম ভেঙে যায়। আবার কখনো রোগী মনে করে যে তার ঘুমানোর কোনো দরকার নেই। একটানা কয়েক দিন না ঘুমিয়ে কাটায়। আবার অতিরিক্ত ঘুমও হতে পারে।

খাদ্য গ্রহণের সমস্যা: খিদে কমে যাওয়া, খেতে না চাওয়া, খেলেও বমি করে দেওয়া অথবা অতিরিক্ত পরিমাণে বেশি খাওয়া বা সব সময় ভালো খাবার খেতে জেদ ধরা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। আবার কখনো মিথ্যা সন্দেহের কারণে বিশেষ খাবার গ্রহণ না করা।

এলোমেলো আচরণ: স্বাভাবিক আচরণ না করা। যেমন ময়লায় গড়াগড়ি, অখাদ্য গ্রহণ, সবার সামনে কাপড় খুলে ফেলা, খারাপ কথা বলা ইত্যাদি। আবার কখনো বিনা উসকানিতে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, ভাঙচুর, মারামারি করা ইত্যাদি।

একই কাজ বারবার করা: একই কাজ বারবার করা, একই চিন্তা বারবার মনের মধ্যে আসা। যেমন বারবার হাত ধোয়া, বারবার টাকা গোনা, অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা বারবার আসা।

অহেতুক ভয়: ভয় মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা, কিন্তু যখন এই ভয় অহেতুক বা অযৌক্তিক হয় তখন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত। এই ভয় কোনো বিশেষ বস্তু বা বিষয়ের প্রতি হতে পারে, আবার সার্বিকভাবে সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত থাকতে পারে।

ব্যাখ্যাতীত শারীরিক লক্ষণ: অনেক সময় কিছু শারীরিক লক্ষণ দেখা যায়, যেটার কোনো ব্যাখ্যা বা কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরীক্ষায় শরীরে কোনো রোগের চিহ্ন পাওয়া না গেলেও যদি শারীরিক লক্ষণ থেকে যায় তবে তা মানসিক কারণে হচ্ছে কি না তা যাচাই করে নেওয়া জরুরি। যেমন কোনো কারণ ছাড়াই হাত-পা, বুক ব্যথা, মাথাব্যথা, বিনা কারণে বমি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা, শরীরের একদিক বা সারা শরীর অবশ ভাব ইত্যাদি।

অসামাজিক আচরণ: সমাজবিরোধী আচরণ বারবার করা, অন্যের সঙ্গে মিশতে না পারা, নিজের ক্ষতি নিজে করা—হাত কাটা, চুল ছেঁড়া ইত্যাদি। পশুপাখিকে বিনা কারণে কষ্ট দেওয়া, হত্যা করা।

আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা: কেউ যদি আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করে তবে অবশ্যই তার কোনো মানসিক সমস্যা আছে কি না তা যাচাই করে নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে যে এসব লক্ষণের বাইরেও অন্যান্য লক্ষণ থাকতে পারে আবার এসব লক্ষণ থাকলেই যে তার মানসিক রোগ আছে তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। একমাত্র মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞই তার রোগ সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে পারেন।

চর্বি কমায় পেঁপে

পেঁপে একটি সর্বজনীন ফল। প্রায় সব ঋতুতেই পেঁপে পাওয়া যায়। কাঁচা ও পাকা উভয় পেঁপেই শরীরের জন্য উপকারী। কাঁচা পেঁপেতে রয়েছে প্রচুর প্রোটিওলাইটিক এনজাইম। এই উপাদানটি প্রোটিন হজমের জন্য সাহায্য করে। তাই প্রচুর পরিমাণে গরু, খাসি বা মুরগির মাংসের সঙ্গে কাঁচা পেঁপে বা রান্না করা পেঁপে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর হয়, মাংসের আমিষ ভালোভাবে রক্তের সঙ্গে মেশে এবং মাংসের চর্বির ক্ষতিকর দিকটা কমিয়ে দেয়। তা ছাড়া মাংসে কাঁচা পেঁপে দিলে তা সিদ্ধ হয় দ্রুত। কাঁচা পেঁপে, শশা, গাজর, লেটুস বা ধনিয়া পাতার সালাদ ওজন কমাতে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পেঁপে যুদ্ধ করে দেহের বাড়তি মেদের বিরুদ্ধে। কাঁচা পেঁপের প্রোটিওলাইটিক এনজাইম ক্যানসার নিরাময়ে রাখে গুরুত্বপূণর্ ভূমিকা। আর এই উপকারের জন্য কাঁচা পেঁপে রান্নার পরিবর্তে কাঁচা খাওয়াটাই উত্তম। প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’র বসতি পাকা পেঁপেতে। ভিটামিন ‘এ, ও ‘সি’ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, যুদ্ধ করে ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে, দাঁত, চুল, ত্বকের জন্য বয়ে আনে সুফল। অ্যান্টি অ্যাজিং ফ্যাক্টর অর্থাৎ বৃদ্ধ বয়সকে দূরে ঠেলে দেওয়ার উপাদান রয়েছে পেঁপেতে। তাই ত্বকের ওপরেও কাজ করে এই ফল। এতে কোনো খারাপ কোলস্টেরল, চর্বি বা ফ্যাট নেই। মোটা মানুষেরা দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে খেতে পারেন। তবে ডায়াবেটিক রোগীরা মিষ্টি পেঁপে পরিহার করুন।
ডা. ফারহানা মোবি

 চনমনে হোক মন

অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর কলম থেকে

মানসিক চাপ কমাতে চাই ভালো বন্ধু, স্বজন ও পরিবার মানসিক চাপ কমাতে চাই ভালো বন্ধু, স্বজন ও পরিবার
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, সাম্মানিক অধ্যাপক ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।

মন যদি হয় মেঘলা আকাশ। শ্রাবণের মেঘ। হতাশ মন। বিষণ্ন। তখন হয়তো প্রয়োজন হতে পারে পেশাদারি পরামর্শ। কিন্তু তবু এসব উপসর্গ একটু হালকা করতে সামান্য কিছু যদি করা যায়, মন্দ কী? ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, এমনকি পোষা বিড়ালের সঙ্গে খুনসুটি মনমেজাজ হতে পারে চনমনে।
 তুলতুলে মিনিটা বড় বন্ধু। ওকে জড়িয়ে ধরে খেলু খেলু করে মেজাজকে হালকা করেন অনেকে। শুধু তা কেন, অপরের জন্য কাজ করা, একটু খেয়াল করা অন্যদের, মনকে করে হালকা।
 স্মার্ট খাওয়া। তুলে ধরে শরীর মন। মনের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক বড়ই নিবিড়। স্বাস্থ্যকর সুষম খাবার মেজাজ ভালো রাখতে বেশ কাজ দেয়। প্রচুর ফল, সবজি, মোটা শস্য উজ্জীবিত করে মনকে, শরীরকেও।
দেখা গেছে বিষণ্ন মনকে হালকা করতে ওমেগা ৩ মেদ-অম্ল ও বি১২ ভিটামিন কাজ দেয়। তৈলাক্ত মাছ যেমন স্যামন, ম্যাকরিল, টুনাতে আছে সেই মেদ-অম্ল। আমাদের দেশের সামুদ্রিক মাছে। তৈলযুক্ত মাছেও। ফ্ল্যাক্সসিড, বাদাম, সয়াবিন ও গাঢ় সবুজ শাকসবজিতেও।
সিফুড ও চর্বি কম দুধজাত দ্রব্যে আছে বেশ ভিটামিন বি১২। কট্টর নিরামিষভোজী যাঁরা মাছ মাংস একেবারে খান না এঁরা ফর্টিফাইড শস্য, দুধজাত দ্রব্য ও সাপ্লিমেন্ট থেকে পান বি১২।
 মন তোলার জন্য লো-ফ্যাট শর্করা
‘সেরোটনিন’ নামে যে মগজের রাসায়নিক, মন ভালো করার জন্য এর অবদান অস্বীকার করার নয়। শর্করা খেলে মগজে সেরোটনিনের মান বাড়ে। লো-ফ্যাট শর্করা যেমন পপকর্ন, সেঁকা আলু, ক্রাকারস, প্যাস্টা। সবজি, ফল, গোটা শস্য থেকে আসে আঁশ।
 ক্যাফেইন গ্রহণ করতে হবে কম,
দুই কাপ তো হয়েছে। তৃতীয় কাপ কেন? বেশি কফি খেলে মেজাজ যায় বিগড়ে, নার্ভাসও লাগে। উদ্বিগ্ন মনে হয়। তাই সোডা, কফি, কোলা কম গ্রহণ করলে মন ভালো হয়। রাতে ঘুমও হয় ভালো।
 ব্যথা-বেদনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বিষণ্নতা, মন খারাপ। তাই ব্যথার চিকিৎসা করলে মনও ভালো হয়।
 চাই ব্যায়াম। ওষুধের চেয়েও ভালো কাজ করে ব্যায়াম। সে জন্য ম্যারাথন দৌড় দিতে হবে কেন? রমনার উদ্যানে জীবনসঙ্গী বা বন্ধুর সঙ্গে হাঁটুন ৪০ মিনিট। শরীর মন ভালো হবে। রাতে হবে ভালো ঘুম।
কেবল হাঁটা কেন? দৌড়াতে পারেন। সাইকেল চালানো। গলফ স্কিপিং ব্যাডমিন্টন। টেনিস। সাঁতার। বাগানে কাজ করা। যাই ভালো লাগে উপভোগ করা যায় এমন ব্যায়াম। একসঙ্গে অন্যদের সঙ্গেও ব্যায়াম করতে পারেন। রোদের আলো যেন বেশি পান। জানেন তো গাঢ় অন্ধকার দিনে মন খারাপ লাগে বেশি। রোদ উঠলে স্ফূর্তি। রোদেলা দিনে বের হবেন অবশ্য।
 নিজের সৃজনশীল শক্তি আরও আবিষ্কার করুন। ছবি আঁকা, ছবি তোলা, গান করা, সেলাই ফোঁড়াই, লেখালেখি। মনের অনুভূতিকে নাড়া দেওয়া, অনুভূতিকে প্রকাশ করা। সৃজনশীল কর্ম করলে মন ভালো হয়। নিজের স্বপ্ন, এতে কি যে আনন্দ!
 চাপ ও দুশ্চিন্তা বিষণ্নতাকে আরও গাঢ় করে তোলে। সেরে উঠতে সময় নেয়। মনকে শিথিল করলে রিলাক্স করতে পারলে শান্তি আসে মনে। তাই ধ্যানচর্চা ও যোগ ব্যায়াম। গান শোনা একান্তে। দীর্ঘক্ষণ স্নান।
 সক্রিয়কর্মে ব্রতী হন।
কাজে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে মনের আনন্দ। কোনো ভালো কাজে। একত্রে কয়েকজন মিলে, মন ভালো হবে।
 জীবনে থাকুক বন্ধু, স্বজন
যারা অবলম্বন দেবে দুঃসময়ে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিন, স্ফূর্তি করুন। বন্ধের দিন কাটান পরিবারের অন্যদের সঙ্গে। মন ভালো হবে।
 চাই স্বাস্থ্যকর ঘুম।
সুনিদ্রা। নিটোল ঘুমে কাটে মনের মেঘ। রোদ ওঠে ঝিকমিক।
 মদ্যপান ও ধূমপান বর্জন।
দেখবেন মন ভালো হবে।
 বিষণ্নতার জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন হলে তাও চালিয়ে যেতে হবে।
ডাক্তারের পরামর্শ তো আছেই।

 বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০১১- প্রয়োজন মহৎ উদ্যোগ

মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা নয়, হতে হবে সচেতন মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা নয়, হতে হবে সচেতন
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রেষণে: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছরের ১০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। ১৯৯৬ থেকে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ দিবসটিতে একটি করে প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করে আসছে। এ বছরের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মহৎ উদ্যোগ নিন: মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করুন’ (দি গ্রেট পুশ: ইনভেস্টিং ইন মেন্টাল হেলথ)। ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ বিষয়টির সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত হলেও এটিকে এড়িয়ে চলা বা গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ বা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে খানিক বেশি। অথচ বর্তমান সময়ে সমস্ত পৃথিবীতে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। যেকোনো আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের নাগরিক, ধর্ম-বর্ণ ও বয়সনির্বিশেষে মানসিক অসুস্থতার শিকার হতে পারে। নগরায়ণ, শিল্পায়ন, অভিবাসন, মাদকের অপব্যবহার এবং বৈশ্বিক ধ্যানধারণার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি। বাংলাদেশে মানসিক রোগীর হার হচ্ছে মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৬.১ শতাংশ শিশু-কিশোরদের মধ্যে ১৮.৪ শতাংশ। বাংলাদেশে এই বিপুলসংখ্যক মানসিক রোগীর বিপরীতে রয়েছে অপ্রতুল জনবল আর নগণ্য বাজেট বরাদ্দ। বাংলাদেশে ১৫ লাখ মানুষের জন্য গড়ে একজনেরও কম মনোযোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন এবং মনোযোগ বিশেষজ্ঞের মধ্যে অধিকাংশই রয়েছেন শহরাঞ্চলে। মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগে শয্যার সংখ্যা সরকারি পর্যায়ে মাত্র ৮২৮টি। ২০০৫ সালে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ। অথচ সহস্রাব্দের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্য বাজেটের ৫ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের সুুপারিশ করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য খাতে প্রায় সব উন্নয়নশীল দেশের চিত্রই এক রকম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায়, ৩০ শতাংশ রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো স্থান নেই— ২৫ শতাংশ রাষ্ট্র তাদের স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ খরচ করে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে। চিকিৎসাসুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, উন্নত দেশে ৩৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ এবং অনুন্নত দেশে ৭৬ শতাংশ থেকে ৮৫ শতাংশ গুরুতর মানসিক রোগী তাদের রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার ১২ মাসের মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করে না। স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে গড়ে প্রতি এক লাখ লোকের জন্য শূন্য দশমিক ০৫ জন মনোরোগবিশেষজ্ঞ ও শূন্য দশমিক ১৬ জন মনোরোগ নার্স আছেন। এ জন্যই এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়ে বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে মহতী উদ্যোগে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই বিনিয়োগ কেবল আর্থিক বিনিয়োগ নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে নীতিনির্ধারক মহলের মেধা আর শ্রমের বিনিয়োগ, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সর্বসাধারণের মনোযোগের বিনিয়োগ। সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারি।
১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যের যে সংজ্ঞা দিয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, ‘কেবল নিরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।’ অথচ কার্যত এই সংজ্ঞার খণ্ডিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয় প্রতিনিয়ত—কখনো সচেতনভাবে আবার কখনো অসচেতনতায়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ‘স্বাস্থ্য’ শব্দটি সীমাবদ্ধ হয়ে ছিল ‘শারীরিক’ অংশটুকুর মধ্যে। তবে আশার কথা এই যে, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেরিতে হলেও বাংলাদেশে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ বিষয়টি ধীরলয়ে প্রবেশ করছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল আঙিনায়।
কিন্তু একুশ শতকের উপযোগী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সবার আগে দরকার বিদ্যমান অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ রূপ প্রদান এবং সে জন্য আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের নীতিমালা প্রণয়ন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে আনুপাতিক গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে আলাদা মানসিক স্বাস্থ্যনীতি তৈরি করা দরকার। এ ছাড়া বাংলাদেশে যে অপ্রতুলসংখ্যক মানসিক চিকিৎসক রয়েছেন, তার ঘাটতি মোকাবিলায় আরও দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং পাশাপাশি বিদ্যমান জনশক্তির মানোন্নয়নে প্রয়োজন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। মাঠপর্যায়ের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও বেশি মানসিক রোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। সাধারণ শিক্ষার হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যশিক্ষায় মানসিক বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিকিৎসাশিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যকে নিয়ে আসতে হবে প্রথম সারিতে। মানসিক রোগীর পরিবারের সদস্য ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে মানসিক রোগ ও এর প্রতিকার-সংক্রান্ত বিষয়ে।
জনগণের দোরগোড়ায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রয়োজন ‘কম্যুনিটি মেন্টাল হেলথ সার্ভিস’, যার অর্থ হচ্ছে কেবল হাসপাতালে বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নয় বরং এই সেবাকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে ন্যূনতম মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মতো পরিকাঠামো তৈরি করা। মানসিক স্বাস্থ্য খাতে ‘অধিকতর’ বরাদ্দের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ‘ন্যায্য’ বরাদ্দ। রোগ ও রোগীর চাহিদা অনুযায়ী যথাযথ শ্রম, মেধা, মনোযোগ আর অর্থের বরাদ্দ প্রয়োজন। নাই নাই করেও বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে অর্জন নেহাত কম নয়। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে আলাদা দুটি জরিপের মাধ্যমে মানসিক সমস্যা, অটিজম, মৃগী আর মাদকাসক্তির প্রকোপ নির্ধারণ করা হয়েছে। মৃগী রোগের ট্রিটমেন্ট গ্যাপবিষয়ক গবেষণা, আন্তদেশীয় বিষণ্নতা পরিমাপক বিষয়ে গবেষণা, গ্লোবাল অ্যালকোহল সার্ভে ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জাতীয় নীতিমালা কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে, বিদ্যমান রয়েছে মাদকাসক্তি আইন। কেবল অসহায় মানসিক রোগীদের মানবাধিকার, চিকিৎসা, চাকরি ও অধিকার সংরক্ষণ বিধিমালাসংবলিত মানসিক স্বাস্থ্য আইনটি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রায় সাতটি জাতীয় পর্যায়ের গাইড বই প্রণয়ন করা হয়েছে, যার আলোকে চিকিৎসক, সেবিকা, স্বাস্থ্যকর্মীসহ নানা পর্যায়ে কর্মরত জনশক্তি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে পারছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়োজন ‘মহৎ উদ্যোগ’। আর এই মহৎ উদ্যোগের ভার কেবল সরকার বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের ওপর চাপিয়ে রাখলে চলবে না, প্রত্যেক সাধারণ মানুষকে তাদের নিজ নিজ শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের পরিবর্তনে অংশ নিতে হবে। মানসিক রোগীকে অবহেলা করে নয়, সমাজ থেকে লুকিয়ে রেখে নয় বরং বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাসেবার আওতায় যত দ্রুত সম্ভব তাকে নিয়ে এসে রাষ্ট্রের উৎপাদশীলতায় তাকে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More

 
Design by Free WordPress Themes | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes