Total Pageviews

Showing posts with label স্বাস্থ্য. Show all posts
Showing posts with label স্বাস্থ্য. Show all posts

Saturday, November 26, 2011

ফুড আর মুডের সম্পর্ক

 আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস শুধু আমাদের শরীরেই প্রভাব ফেলে না, খাদ্যের ধরনের ওপর নির্ভর করে আমাদের মুডও।
 
সম্প্রতি আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ফ্যামিলি ফিজিয়ানস এমন কিছু খাবার এবং খাদ্য উপাদানের কথা জানালো যা আমাদের মেজাজকে ভালো এবং চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করে।
 
·      ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড। এই এসিড আমাদের গরম মেজাজ বা অশান্ত মনকে কাবু করতে সাহায্য করে। ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায় সামুদ্রিক মাছ এবং আখরোটে।
·      মুরগি ও গরুর গোশত, সয়া এবং দুগ্ধজাত খাদ্যে থাকে ট্রাইপটোফান নামের এক ধরনের উপদান। যার নিয়মিত গ্রহণের ফলে উত্তেজিত এবং অস্থির মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।
·      সবুজ শাক-সবজি এবং বাদামে থাকে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম। সুস্থ, শান্ত এবং স্থির মানসিক স্বাস্থের জন্য এই উপদানটিও অনেক উপকারী।
·      সবুজ শাক-সবাজতে আরো এক ধরনের উপকারী উপাদান আছে, যার নাম ফলিক এসিড। এই উপাদানটি তাজা রঙিন ফলেও পাওয়া যায়। এই উপাদানটি মস্তিষ্কে এক ধরনের স্থির অবস্থার সৃষ্টি করে এবং চাঞ্চল্য কমায়। এর ফলে আপনার মুড বা মেজাজ থাকে ফুরফুরে।
·      খাদ্যের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত মেজাজ-মর্জিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আরেকটি উপকারী উপাদান হলো ভিটামিন বি-১২। দুগ্ধজাত খাবার, গোশত এবং মাছে এই উপাদানটি থাকে প্রচুর পরিমাণে। এর মাধ্যমে মস্তিষ্ক সুশৃঙ্খলভাবে তার কাজগুলো সম্পাদন করে, যার ফলে মেজাজও ঘন ঘন বিগড়ে যায় না।
 
মেজাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখার এই দিকনির্দেশনার পাশাপাশি আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ফ্যামিলি ফিজিয়ানস আরো জানিয়েছে, এই সব খাদ্য নিয়মিত গ্রহণের ফলে ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকলে মেজাজ মর্জি থাকবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, আমেরিকার অধিকাংশ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডিপ্রেশন এবং শর্ট টেম্পারড রোগীদের এই খাবারগুলো খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
 
বার্তা২৪ ডটনেট/আর/এসএফ

Saturday, October 8, 2011

কম ঘুমে পুরুষত্বহীনতা

টেস্টোটেরন পুরুষের হরমোন। এ হরমোনই পুরুষের পুরুষত্বের ধারক-বাহক। পুরুষের সুঠাম দেহের জন্য দায়ী এ হরমোন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা শরীরে কমে যেতে থাকে। ঝুলে পড়ে চামড়া; দেখা দেয় বলিরেখা। শরীরে শক্তি কমে যেতে থাকে। কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া কষ্টকর হয়। হাঁপিয়ে পড়ে একটুতেই। শুধু তাই নয়, এ হরমোনের মাত্রা কমে গেলে কমে যায় যৌন ক্ষমতা। সম্প্রতি জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, কম ঘুমালে পুরুষের শরীরে টেস্টোটেরনের মাত্রা কমে যায়। গবেষণার জন্য বেশ কিছু যুবককে বাছাই করা হয়। তাদের রক্তে টেস্টোটেরনের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। এক সপ্তাহ বাসায় আট ঘণ্টা করে ঘুমানোর জন্য বলা হয়। এর পর তাদের স্লিপ ল্যাবরেটরিতে প্রথম তিন দিন ১০ ঘণ্টা ও পরের আট দিন ৫ ঘণ্টা করে ঘুমাতে দেওয়া হয়। এর পর তাদের রক্তে টেস্টোটেরনের মাত্রা নির্ণয় করা হয়। দেখা যায়, এদের এ হরমোন ১০-১৫ ভাগ কমে গেছে। এর মাত্রা কমার কারণে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। গবেষকরা তাই নিয়মিত আট ঘণ্টা ঘুমানোর জন্য বলেছেন
অোজাদুল কবির আজাদ
রিসার্চ অফিসার, আইসিডিডিআরবি, ঢাকা
সমকাল

Thursday, July 28, 2011

মাথাব্যথা ও বমি

সমস্যা: আমার বয়স ১৮, কলেজে পড়ি। প্রায় দুই বছর ধরে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রচণ্ড মাথাব্যথা হয়। আর মাথাব্যথার সময়কিছু খেলে বমি হয়। বিশেষ করে মাথার সামনের দিকে বেশি ব্যথা করে এবংচোখ লাল হয়। আমি দুই মাস আগে একজন নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে ‘ডিসোপ্যান ০.৫’ এবং ‘ইনডেভার ৪০’ ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। ওষুধগুলো খাওয়ার পর ও মাথাব্যথা ও বমি হয়েছে।আমার ভয় কোনো জটিল অসুখ হলো কিনা। কী করলে আমার সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারব?
নাম-ঠিকানা প্রকাশেঅনিচ্ছুক
পরামর্শ: একদম ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এটা খারাপ ধরনের অসুখ না। একজন চক্ষুবিশেষজ্ঞের কাছেগিয়েচোখ দেখিয়েনিন। সঙ্গে সাইনের একটি এক্স-রে করানোও দরকার।আপাতত স্টেমিটিল ৫ এমজি সকালে খাবারের আগে খেতে থাকবেন।বেশি মাথাব্যথা হলে প্যারাসিটামল খেতে পারেন। অতিরিক্ত টেনশন পরিহার করুন। ধূমপানে অভ্যস্ত থাকলে ত্যাগ করুন।
পরামর্শ দিয়েছেন এ বি এম আবদুল্লাহ
ডিন, মেডিসিন অনুষদ, অধ্যাপক
মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

Thursday, July 14, 2011

ফলমূল মাছ-মাংসে রাসায়নিক: হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

chemicals-in-foods
আজকাল বাজারে ফলমূলের দোকানে গেলে মৌমাছি চোখে পড়ে না, মাছের বাজারে নেই মাছের গন্ধ আর মাছির আনাগোনা। এর কারণ কী? উত্তর একটাই—তা হলো, মাছে ফরমালিন মেশানোর ফলে বাজারে মাছের আঁষটে-পচা দুর্গন্ধ আর থাকে না। একইভাবে কোনো ফলমূলের দোকানেও মৌমাছির আনাগোনা নেই বললেই চলে। কারণ, কারবাইড মেশানোর কারণে মৌমাছি আর মধু আহরণ করতে ওই ফলে যায় না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এগুলো বেশিদিন তাজা রাখার উদ্দেশ্যে ফরমালিন, কারবাইড ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে আমাদের দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় দুধ, ফল, মাছ-মাংস এমনকি শাক-সবজিতেও ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকে। এসব কেমিক্যাল একধরনের বিষ, যা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হবে না; কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।
এমনও শোনা যায় যে অনেক ব্যবসায়ী ফরমালিন পানিতে মিশিয়ে বরফ তৈরি করেন, আর সেই বরফে মাছ-মাংস সংরক্ষণ করেন। বাজারে আম, জাম, কলা, লিচু, পেঁপে—সব কিছুতেই কারবাইড মেশানো হয় এবং অনেক সময় ভেজালবিরোধী অভিযানে এসব ধ্বংসও করা হয়।
ফরমালিন সাধারণত মানুষের লাশসহ মৃত প্রাণীকে তাজা রাখতে ব্যবহার করা হয়। ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও মিথানল থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। দুটোই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট, ব্রেন—সবকিছুুকে ধ্বংস করে দেয়। লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। হার্টকে দুর্বল করে দেয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়। শেষ পর্যন্ত ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যানসার হতে পারে। অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ, এমনকি ব্লাড ক্যানসারও হতে পারে। এতে মৃত্যু অনিবার্য। মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে। ফরমালিন কেবল ভোক্তাদের জন্য নয়, ফরমালিনযুক্ত মাছ বিক্রেতাদের জন্যও ক্ষতিকর।
ফরমালিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল এবং বিষাক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। কিডনি, লিভার ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা, এমনকি মরণব্যাধি ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোরেরা। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে। বয়স্ক লোকেরাও এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে।
এ ধরনের খাদ্য খেয়ে অনেকে আগের তুলনায় এখন কিডনি, লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের সমস্যায় ভুগছেন। দেখা যাচ্ছে, কয়েক দিন পরপর একই রোগী ডায়রিয়ায় ভুগছেন, পেটের পীড়া ভালো হচ্ছে না, চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
একবার চিকিৎসা শেষে আবারও তাঁরা একই রোগ নিয়ে হাজির হচ্ছেন। আগে হাসপাতাল-ক্লিনিকে এত রোগী দেখা যেত না। ফল-দুধ-মাছ-মাংসে বিভিন্ন কেমিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব এ অবস্থার অন্যতম কারণ।
এই বিষক্রিয়ার ফল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর হবে ভয়াবহ। আজকের শিশুরাই তো আগামীর ভবিষ্যৎ। ভেজাল খাবার কিংবা বিষাক্ত কেমিক্যাল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা সাদা চোখে দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে এর খারাপ ফলাফল আমরা পাব। মানুষকে ঘন ঘন হাসপাতালে যেতে হবে। এতে দিন দিন মানুষের চিকিৎসা-ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। শিশুরা কম বুদ্ধিসম্পন্ন হবে, স্মৃতিশক্তি থাকবে না, শরীরে শক্তি থাকবে না, ভারী কোনো কাজ করতে গেলে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। এরাই তো একসময় দেশের নেতৃত্বে আসবে। বিভিন্ন পেশায় কম মেধাসম্পন্ন লোক ভরে যাবে। এদের মধ্যেই কেউ ডাক্তার হবে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হবে, কেউ সচিব হবে, কেউ রাজনীতিবিদ হবে। মোটকথা, একসময় পুরো জাতি মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। দেশ ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
এ থেকে প্রতিকার পেতে হলে সাধারণ মানুষকে বেশি সচেতন হতে হবে। বাজারে ফল-মূল দেখে-শুনে কিনতে হবে। জনগণকে ফরমালিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানাতে হবে।
সরকারকে আইনের মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসন করতে হবে। ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার থেকে নিরাপদ থাকতে ভেজালবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। দেখা যায়, আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় ভেজাল রোধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এমনকি আইনে মাছ, মাংস, ফলমূল ও সবজির ভেজাল পরীক্ষারও কোনো বিধান নেই। যারা খাবারে ভেজাল মেশায়, পরোক্ষভাবে তারা পুরো জাতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ জন্য তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত। সরকার কঠোর হলেই খাবারে ভেজাল দূর করা সম্ভব। খাদ্যে ভেজাল পরীক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিতে হবে। প্রতিটি খাবার ভেজাল পরীক্ষা করে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। ভেজালকারীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ফরমালিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল বিক্রি বন্ধ করতে হবে। মাঝে ভেজালবিরোধী অভিযানের সময় খাবারে ভেজাল দেওয়া কিছুটা কমে গিয়েছিল। মানুষও সচেতন হয়েছিল। কিন্তু এখন আবারও খাবারে ভেজালের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।
জনগণের সম্পৃক্ততা, সচেতনতা ও সরকারি উদ্যোগের দৃঢ়তার মাধ্যমেই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।
এ বি এম আবদুল্লাহ
ডিন, মেডিসিন অনুষদ, অধ্যাপক
মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

ক্যানসারের ঝুঁকি ও জীবনযাপন


জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক কমানো যায়, জেনেছেন বিজ্ঞানীরা। বংশগতি ক্যানসারের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিলেও সত্যিকারের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলে ক্যানসার হওয়া ঠেকানো যায় অনেকাংশেই।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে ক্যানসারের এক-তৃতীয়াংশ জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িত, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে।
ধূমপান করে থাকলে ছাড়ুন, সিগারেটের, বিড়ির ধোঁয়া থেকে দূরে যান, তামাক-জর্দা চিবাবেন না আমেরিকার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকায় ফুসফুসের ক্যানসারে যত লোক মারা যায় স্ত্রী ও পুরুষ, তা অন্যান্য ক্যানসারে হত লোকের চেয়ে বেশি, সব ক্যানসারে মৃত্যুর ২৮ শতাংশ, প্রতিবছর ১৬০,০০০ জন লোক। তা কেবল ফুসফুসের ক্যানসার। ধূমপান আরও এক ডজন ক্যানসারের সঙ্গে জড়িত, সবগুলো ক্যানসারে মৃত্যুর ৩০ শতাংশ।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হলো ধূমপান বন্ধ করা বা একেবারেই শুরু না করা একেবারে বন্ধ করতে না পারলেও কমাতে পারলে লাভ আছে। তবে একেবারে বন্ধ করাই ঠিক। তামাক-জর্দা-গুল চিবানোও ক্ষতিকর। এটিও ক্যানসারজনক, মুখগহ্বরের ক্যানসারের বড় ঝুঁকি। ওজন বেশি হলে কমান। শরীরের মধ্যে ওজন বেশি হলে অনেকেই জানেন হূদ্যন্ত্রের ক্ষতি হয়।
প্লেটে বেশি থাকুক উদ্ভিজ্জখাদ্য
নানা ধরনের খাদ্য আছে যা নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার ঠেকায়। যেমন টমেটো, তরমুজ ও অন্যান্য খাদ্যে আছে ‘লাইকোপেন’ যা প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। প্রমাণ আছে। খাবার প্লেটে তাই থাকুক উদ্ভিজ্জ খাদ্য, শ্বেতসারহীন শাকসবজি ও ফল বেশি করে।
তাই AICR-এর পরামর্শ হলো, খাবেন বেশি উদ্ভিজ্জখাদ্য প্রতিদিন—অন্তত ১৪ আউন্স। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ডায়েট, সেন্ট ট্রপেজ ডায়েট, ুিগ্রন ডায়েট—সবই ফল ও সবজির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ক্যানসার প্রতিরোধক খাদ্য উদ্ভিদখাদ্যবহুল বটে। AICR-এর নতুন প্লেট প্ল্যান হলো: খাবার প্লেটের দুই তৃতীয়াংশজুড়ে থাকবে ফল, সবজি, বিনস ও গোটা শস্য। অন্য এক-তৃতীয়াংশে কচি গোশত, মাছ ও কম চর্বি দুধজাত দ্রব্য।
মদ্যপান করে থাকলে বর্জন করুন
স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে বললে মদ্য হলো দুই ফলা তলোয়ারের মতো। ক্যানসারের জন্য মদ্যপানের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। যত পান করবেন, ঝুঁকি তত বেশি। মুখ, গলা ও খাদ্যনালির ক্যানসারের ঝুঁকি। আর সেই সঙ্গে ধূমপান ও কবলে ঝুঁকি হয় ভয়ানক।
অনেকে তাই বলেন, দিনে একবার মাত্র। তবে আমরা বলি, মদ্যপান বর্জনই শ্রেয়।
ঝেড়ে ফেলুন চাপ শরীর ও মন থেকে
চাপ হয়তো সরাসরি ক্যানসার ঘটায় না, তবে এর পরোক্ষ প্রভাব আছে। চাপ বেশি হলে মানুষ অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে আসক্ত হয়ে পড়ে চাপকে সামাল দেওয়ার জন্য।
অতিভোজন হয়, মদে বুঁদ হয় মানুষ, নিজে নিজে নানা ওষুধ খায়, বাড়ে ক্যানসারের ঝুঁকি। তাই চাপ মোকাবিলায় ব্যায়াম, ধ্যানচর্চা, প্রাণায়াম, যোগব্যায়াম, কত উপায় আছে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে মানসিক চাপ কমে, শরীরও থাকে ভালো।
করুন স্ক্রিনিং টেস্ট
বিভিন্ন ক্যানসারের স্ক্রিনিং টেস্ট যেমন ম্যামোগ্রাম, পিএসএ স্ক্রিনিং ক্যানসার রোধ করে না, তবে আগাম শনাক্ত হতে সহায়তা করে, চিকিৎসাযোগ্য পর্যায়ে।
অন্যান্য টেস্ট যেমন প্যাপ স্মিয়ার ও করোনোস্কোপি ক্যানসারপূর্ব পরিবর্তন চিহ্নিত করে, তা এখন চিকিৎসা না হলে জরায়ু ক্যানসার ও কলোন ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। কি কি স্ক্রিপিং টেস্ট কখন করা দরকার সে ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জেনে নিন শিকড়ের কথা
নিজের পরিবারের ইতিহাসের কথা, রোগ, বৃত্তান্ত, সমস্যার কথা জানা উচিত। তা জানলে নিজের ক্যানসারের ঝুঁকি নিরূপণেও প্রতিরোধে কৌশল টানা সম্ভব।
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস,
বারডেম হাসপাতাল,
সাম্মানিক অধ্যাপক,
ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

তেলাপোকা থেকে সাবধান!

telapoka
আমার নাতনি তেলাপোকা দেখে ভীষণ ভয় পায়। ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে। ভয় পায়, যদি শরীরে বসে? বিচ্ছিরি! যদি কামড় দেয়? আমিও তেলাপোকাকে ভয় পাই। তবে শরীরে বসা বা কামড়ের ভয় নয়, ভয় অন্য কারণে। তেলাপোকা যে অনেক রোগের বাহক! নানা রকমের পেটের পীড়া, আমাশয়, ডায়রিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া, টাইফয়েড, লিভারের প্রদাহ-জন্ডিস, পোলিও—কত রোগের জীবাণুরই না বাহক তেলাপোকা!
তেলাপোকা মূলত সর্বভুক। তবে খাবারের ময়লা-আবর্জনা আর বাথরুমের ময়লাই এদের প্রিয় খাবার। এসব ময়লা-আবর্জনা থেকে এদের গায়ে লেগে যায় নানা জীবাণু। পেটের ভেতরেও ঢুকে যায় অজস্র। তারপর রাতের আঁধারে যখন বসে কোনো খাবারের ওপর, তখন তেলাপোকার পা-পাখা-শরীর থেকে খাবারে লেগে যায় অসংখ্য জীবাণু। তা ছাড়া, খাবারের ওপর ঘোরাফেরা করার সময় খাবার খাওয়ার পাশাপাশি খাবারের ওপর মলত্যাগ আর বমিও করে তেলাপোকা। তেলাপোকার এসব মল আর বমির মাধ্যমেও খাবারে মিশে যায় হাজারো জীবাণু। জীবাণুমিশ্রিত এসব দূষিত খাবার খেলেই হয় নানা অসুখ। এ ছাড়া তেলাপোকার শরীর থেকে খসে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ আর ঘরের ধুলোবালিতে মিশে থাকা তেলাপোকার শুকনো মল হতে পারে হাঁপানির কারণ। আমাদের বাড়িঘরের রান্নাঘরে লুকোনো স্থানেই এদের বসবাস বেশি। দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে রান্নাঘরের বেসিনের নিচে, ময়লার বালতিতে, খাবার রাখার আলমারিতে (মিটসেফ) রাখা জিনিসের ফাঁকে ফাঁকে, আলমারির পেছনে, ফ্রিজের পেছনে। এ ছাড়া থাকে বাথরুমের প্যানের গভীরে, বাসাবাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া মলের বা ময়লার পানির পাইপে। থাকে বইয়ের আলমারিতে বইয়ের ফাঁকে। খাটের বাক্সে। যেকোনো অন্ধকার লুকোনো স্থানে। এসব জায়গা থেকে রাতের আঁধারে বের হয়ে আসে। রাতে রান্নাঘরের মেঝে বা খাবার টেবিলে খাবারের উচ্ছিষ্ট থাকলে, বেসিনে এঁটো থালাবাসন রেখে দিলে তাতে রোগজীবাণু বংশবৃদ্ধি করে। আর এসব খাবার খেতে থাকে তেলাপোকা। বাহক হয় নানা জীবাণুর।
রাতে খাবার টেবিলে খাবারের উচ্ছিষ্ট যেন না থাকে। পরদিন সকালে ধোয়ার আশায় রাতভর বেসিনে যেন না থাকে এঁটো থালাবাসন। পরিষ্কার রাখতে হবে তেলাপোকা লুকিয়ে থাকতে পারে এমন সব জায়গা। রান্নাঘরের মেঝে ও বেসিন রাখতে হবে ঝকঝকে তকতকে। ঢেকে রাখতে হবে রান্নাঘরের ময়লার বালতি। পরিষ্কার করতে হবে প্রতিদিন। রান্নাঘরের দা, বঁটি, কাটিং বোর্ড ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার রাখতে হবে। মিটসেফ পরিষ্কার করতে হবে প্রতি সপ্তাহেই। টেবিলের ড্রয়ার, খাটের বাক্স, বুকসেলফ—প্রতি সপ্তাহেই নজরদারি করতে হবে। খাবার-দাবার রাখতে হবে ফ্রিজে। বাইরে রাখলে অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে। বাথরুম রাখতে হবে পরিষ্কার। বেশি উপদ্রব হলে তেলাপোকা মারার চক বা অন্য ওষুধ ব্যবহার করতে হবে মাঝে মধ্যে।
মো. শহীদুল্লাহ
বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ,
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

জিহ্বা দেখে রোগ চেনা


জিহ্বা দেখেসর্বক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও রোগ সম্পর্কে একটি ধারণা অবশ্যই লাভকরা সম্ভব।তবে সে ক্ষেত্রে জিহ্বা দেখার কিছু নিয়মনীতি মেনে চলা প্রয়োজন। জিহ্বার অগ্রভাগ যদি লাল হয় তবে তা মানবদেহের হূদ্যন্ত্রে তাপ সৃষ্টির নির্দেশনা দিয়ে থাকে। কারণ, হূদ্যন্ত্রের অবস্থার সঙ্গে জিহ্বার অগ্রভাগের সম্পর্করয়েছে।জিহ্বার অগ্রভাগের ঠিক পেছনের অংশের সঙ্গে ফুসফুসের যোগসূত্র রয়েছে। জিহ্বার পাশের অংশ দেখে লিভার বা যকৃতের অবস্থা সম্পর্কেধারণা করা যায়।জিহ্বার মধ্যবর্তী অংশপাকস্থলী, প্লীহা বা হজমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।জিহ্বার পেছনের অংশকিডনির অবস্থা সম্পর্কে একটি নির্দেশনা প্রদান করে। এ ছাড়া অসুখ-বিসুখ যেমন—ঠান্ডা এবংহজমজনিত সমস্যা সম্পর্কেও নির্দেশনা প্রদান করে। জিহ্বার অগ্রভাগ যদি চোখা হয়তবে তা একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত দৃঢ়অবস্থানের কথা জানান দিয়ে থাকে।শুধু তাই নয়, জিহ্বার অগ্রভাগ যদি চোখা হয় তাহলে ধারণা করা যায় যে ওই ব্যক্তি মানসিকভাবে আগ্রাসী অথবা আক্রমণাত্মক হতে পারে। জিহ্বার অগ্রভাগ বিভক্ত থাকলে বুঝতে হবে ওই ব্যক্তির শারীরিক বা মানসিক ভারসাম্য কম থাকলেও থাকতে পারে। এ ছাড়া চিন্তা ও চেতনা খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। জিহ্বার অগ্রভাগ যদি গোলাকৃতির হয় তা মানসিক এবংশারীরিক দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান দেয়। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে কেউ যেন কারও জিহ্বা দেখার চেষ্টা না করেন। কারণ, এসব ক্ষেত্রে জিহ্বা দেখতে হলে বিশেষ কিছু পদ্ধতি এবংকৌশল অবলম্বন করতে হয় যা এই বিষয়েঅভিজ্ঞ একজন ডাক্তারের পক্ষেই সম্ভব।
মো. ফারুক হোসেন
মুখ ও দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

Wednesday, July 13, 2011

ওজন কমানোর উপায়


তায়েবা সুলতানা
স্থূলতা ওজনাধিক্য শব্দটির সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। কারণ এটি এখন বহুল আলোচিত একটি বিষয়। নাগরিক জীবনে কারও কারও ক্ষেত্রে স্থূলতা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওজনাধিক্যের জন্য বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। তাই আমরা সকলেই ওজনাধিক্য নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। কিন' দেখা যায় বিভিন্ন কারণে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। আসলে ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছা এবং চেষ্টা। আসুন আমরা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার সহজ কয়েকটি টিপস জেনে নিই।
  • প্রতিবেলা খাবার আগে অবশ্যই এক গ্লাস পানি পান করুন।
  • খাবার সময় মজার বা প্রিয় খাবার দেখে উদরপূর্তি করে না খেয়ে আধপেট খান/পেট খালি রেখে খান।
  • খাবারের সময় অবশ্যই চর্বি জাতীয় খাবার বাদ দিয়ে খান। বিশেষ করে মাছ ও মাংসের চর্বি, ঘি, মাখন, পনির ইত্যাদি।
  • ক্ষুধা না পেলে কখনোই খাবেন না।
  • বাজি ধরে বা বন্ধুদের সাথে সেলিব্রেট করার সময় খাবার না খেয়ে বরং কোথাও ঘুরে আসুন।
  • ফাস্টফুড জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন। কারণ এগুলো উচ্চ ক্যালরি ও উচ্চ ফ্যাটবহুল খাবার। এসব খাবারের সাথে আপনি নিজের অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করে ফেলেছেন।
  • যতটা সম্ভব হাঁটাহাঁটি করুন। যেমন- কাছাকাছি দূরত্বে কোথাও হেঁটে যান, উপরে উঠতে লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়িতে চলুন।
  • স্ন্যাকস হিসেবে ফল খাওয়ার অভ্যাস করুন।
  • কারও আশায় না থেকে নিজের ছোট ছোট কাজ নিজেই করুন। যেমন- এক গ্লাস পানির জন্য কাউকে না বলে নিজেই উঠে গিয়ে নিয়ে নিন।
  • অনেকেই বলেন, সময়ের অভাবে এক্সারসাইজ করতে পারেন না তাই যখনই সময় পান ফ্রি হ্যান্ড কিছু এক্সারসাইজ করুন। যেমন- সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানাতে বসেই কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে পারেন।
  • সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের ওজন মাপুন। কারণ ওজন যদি স্বাভাবিক থাকে সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
আসুন আমরা স্থূলতাকে ভয় না পেয়ে সহজভাবে একে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি। কারণ স্থূলতা বা ওজনাধিক্য থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, হাইপারটেনশন ইত্যাদি রোগ দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যক্তির ইচ্ছার সাথে সাথে বন্ধুত্বের পরিবেশও একান্ত কাম্য।
লেখক : নিউট্রিশনিস্ট এন্ড ওয়েট ম্যানেজমেন্ট
কনসালটেন্ট
ডার্মালেজার সেন্টার
৫৭/ই, পান'পথ, ঢাকা
সাইক্লিং ভালো ব্যায়াম
ডা. মো. শহীদুল্লাহ
সাইকেল অর্থাৎ বাইসাইকেল চালানো হাঁটা এবং সাঁতার কাটার মতো একটি উৎকৃষ্ট ব্যায়াম। নিয়মিত সাইকেল চালানো শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এতে রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে। রক্তচাপও কমে। সপ্তাহে ৩৫ কিলোমিটারের মতো পথ সাইকেল চালালে করোনারি হৃদরোগের সম্ভাবনা কমে যায় ৫০ শতাংশেরও বেশি।
নিয়মিত সাইকেল চালানো শরীরের ওজন কমাতে সহায়ক। সাইকেল চালালে শরীরের জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পায়। ঘণ্টায় মোটামুটি ২০ কিলোমিটার গতিতে সাইকেল চালালে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৫৫০ ক্যালরি শক্তি খরচ হয়। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিনের এক গবেষণার কথা এটি। এত এনার্জি খরচ হয় বলে নিয়মিত সাইকেল চালালে যারা মোটা তাদের বাড়তি ওজন কমে শরীরের ওজন হয়ে যায় স্বাভাবিক। নিয়মিত সাইকেল চালালে মোটা লোকদের স্বাভাবিক ওজন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ-এ তথ্য পাওয়া গেছে আর্কাইভস অব পেডিয়েট্রিকস অ্যান্ড এডোলিসেন্ট মেডিসিন নামক জার্নালের ২০০৮ সালের এক সংখ্যায়।
আর যাদের শরীরের ওজন স্বাভাবিক নিয়মিত সাইকেল চালালে তাদের শরীরের ওজন বাড়ার সম্ভাবনাও যথেষ্ট কম। ২০০৮ সালে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন নামক এক জার্নালে অস্ট্রেলিয়ার একজনের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফল এরূপই। দেখা গেছে যারা তাদের কর্মক্ষেত্রে সাইকেল চালিয়ে যান তাদের মোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৪০ শতাংশ। পক্ষান্তরে যারা তাদের কর্মস্থলে গাড়িতে চলে যান তাদের মোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি, প্রায় ৬১ শতাংশ। নিয়মিত সাইকেল চালালে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং শরীরের ওজন কমালে কিংবা শরীরের ওজন সঠিক রাখলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমে। নিয়মিত সাইকেল চালালে পাওয়া যাবে এসব উপকার। মুক্ত বাতাসে সাইকেল চালনায় শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়। ফলে ফুসফুসে বাড়তি অক্সিজেন সরবরাহ হয়। এতে ফুসফুসের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। শ্বাসনালির অসুখ প্রতিরোধের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
সাইকেল চালালে রোগ প্রতিরোধী কিছু কোষও তৈরি হয় শরীরে। ফলে সাধারণভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
নিয়মিত সাইকেল চালানো পেশি গঠনে সহায়ক, বিশেষ করে নিম্নাঙ্গের ঊরু কাফ ও পিঠের পেশি। এতে ঊরু, কাফ ও নিতম্ব হয় সুগঠিত। নিয়মিত সাইকেল চালালে জানুসন্ধি এবং পায়ের অন্যান্য সন্ধি সবল হয়। আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনাও কমে।
সাইকেল চালানোর সময় শরীর ঘামে বেশ। ঘামের সাথে শরীরের বর্জ বের হয়ে যায়। ত্বক ও শরীর থাকে সুস'। সাইকেল চালালে রক্তে নিঃসরণ হয় ভালো লাগার হরমোন এন্ডোরফিন। তাই মুক্ত বাতাসে সাইকেল চালালে মনে প্রশান্তি আসে, মন ভালো লাগে। এন্ডোরফিন স্ট্রেসও কমায়। শিশু সাইকেল চালালে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। সাইকেল চালানো তাই শিশুর সার্বিক বিকাশে সহায়ক। সাইকেল চালানোয় এতসব উপকার যেখানে সেখানে নিয়মিত সাইকেল চালানোর অভ্যাস গড়ে তোলা মন্দ নয় মোটেও। সেটা অফিসে যাওয়ার জন্যই হোক, বাজারে যাওয়ার জন্যই হোক, অন্য কোনো প্রয়োজনে হোক কিংবা শুধু ব্যায়ামের জন্যই হোক।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ
কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ
ময়মনসিংহ
sunargo.info

গরমে ঘাম ও তার প্রতিকার


আমরা ঘামি কেন?
কিডনি আমাদের শরীরে ছাঁকনির কাজ করে-এ কথা সবারই জানা। শরীরের যাবতীয় দূষিত পদার্থ কিডনির ছাঁকনিতে ছেঁকে নিয়ে বাইরে বের করে দেয়া হয়। ভাবছেন, ঘামের সঙ্গে কিডনির সম্পর্ক কী! নিকট একটা সম্পর্ক তো আছেই। কেননা ঘামের সঙ্গে শরীরের অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস বাইরে বেরিয়ে আসে। তাই বোধহয় প্রাচীন যুগে কিডনি বিকল হলে ডায়ালাইসিস করার ব্যবস্থা না থাকায়, রোগীকে গোটা কতক কম্বল চাপা দিয়ে রাখা হতো। এর ফলে কিডনি ফেইলিওর রোগীর শরীর থেকে প্রচুর ঘাম বের হতো। শরীরের কিছুটা বর্জ্য পদার্থ ঘামের সাহায্যে বেরিয়ে যাওয়ায় রোগী কিছুটা সুস'বোধ করত। তাই এ কথা বলাই বাহুল্য, শরীর সুস্থ রাখতে এবং শরীরের মধ্যে থাকা অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দিতে ঘাম অপরিহার্য। সুতরাং ঘাম কম করার জন্য অযথা মাথা ঘামিয়ে সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করে না তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ঘাম দুই রকম
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ডাক্তারি মতে ঘাম প্রধানত দুই ধরনের। (১) এক্রিন ঘাম (eccrine) এবং (২) অ্যাপোক্রিন ঘাম (apocrine)।
এক্রিন ঘাম
কায়িক পরিশ্রমে অথবা বাইরের তাপমাত্রার প্রভাবে শরীরের তাপ কিছুটা বেড়ে যায়। তখন আমাদের শরীরের সিস্টেম চায় তাপমাত্রাকে স্বাভাবিক রাখতে। ঠিক তখনই এক্রিন গ্রন্থি সক্রিয় হয়ে ঘাম নিঃসরণ করে। সাধারণ এই ঘামই ডাক্তারি মতে এক্রিন ঘাম। যা বাষ্প হয়ে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের শরীরে দুই থেকে চার মিলিয়ন এক্রিন ঘামের গ্রনি' থাকে। গরমের সময় সারা শরীর থেকে বেশ কয়েক লিটার ঘাম বেরিয়ে যায়। ঘর্মগ্রনি' থেকে ঘাম নিঃসরণের সম্পূর্ণ ব্যাপারটা নির্ভর করে নার্ভের কন্ট্রোলের ওপর।
বেশি তাপ এবং অতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রম ছাড়াও ইমোশনাল কারণে ঘাম নিঃসরণ বাড়ে। তবে এ সময়ে হাত-পায়ের তালু আর বগলই বেশি ঘামে। হার্ট অ্যাটাকের সময়েও ঘামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
অ্যাপোক্রিন ঘাম
অ্যাপোক্রিন ঘামের গ্রন্থি থাকে বগলে এবং যৌনাঙ্গের চারপাশে। এক একজন মানুষের গায়ে একেক রকম গন্ধ সৃষ্টি করে এই অ্যাপোক্রিন ঘাম। তবে অ্যাপোক্রিন ঘামের গ্রন্থিগুলো শৈশবে নিষ্ক্রিয় থাকে। বয়ঃসন্ধির পর থেকে এ ধরনের ঘাম নিঃসরণ শুরু হয়। প্রসঙ্গত, অ্যাপোক্রিন গ্লান্ডের পাশাপাশি এক্রিন ঘামের গ্রন্থিও থাকে। যদিও মানুষে মানুষে আলাদা গন্ধ সৃষ্টির জন্য অ্যাপোক্রিন ঘাম দায়ী, কিন' এই ঘাম যখন প্রথম ত্বকের ওপর বেরোয় তখন তার কোনো দুর্গন্ধ থাকে না। কিন' ত্বকের ওপর থাকা জীবাণুরা যুদ্ধ শুরু করে দেয় ঘামের সঙ্গে। আর এর ফলেই যত গন্ধের উৎপত্তি।
কেন ঘাম বেশি হয়
  • ঘাম বেশি না কম হবে তা কিছুটা নির্ভর করে বংশগতির ওপর।
  • কিছুটা পরিবেশের ওপর।
  • অনেকটাই শারীরিক পরিশ্রমের ওপর এবং
  • মানসিক অবস্থা অর্থাৎ উৎকণ্ঠা, টেনশন আছে, না মানসিক ধৈর্যের অধিকারী তার ওপর। উদাহরণ হিসেবে ক্রিকেট খেলার কথা ভাবা যায়। যেমন-
  • মাঠে অত্যন্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে প্লেয়ারদের। তাই তারা প্রচণ্ড ঘামছেন।
  • তাদেরই সহ-খেলোয়াড় ব্যাট হাতে প্যাড পায়ে তৈরি। উত্তেজনায় কপালে স্বেদবিন্দু।
  • অন্যদিকে বাড়িতে টেলিভিশনের পর্দায় যারা খেলা দেখছেন তারাও উত্তেজিত। বলাই বাহুল্য এরাও ঘামছেন, তবে পরিমাণে কম।
  • তবে কম-বেশি যাই হোক না কেন, ঘাম সবারই হয়।
আরবে ঘাম হয় না কেন
এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ঘাম হয় ঠিকই, কিন' তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি বলে সঙ্গে সঙ্গে তা শুকিয়ে যায়। ঘাম হয়েছে বোঝার আগেই ঘাম উধাও। এই কাণ্ডই চলে চক্রাকারে। বাংলাদেশের বাতাসের আর্দ্রতা ঘামকে সহজে শুকাতে দেয় না। ঘামে জবজবে হয়ে থাকতে হয়। এটা কিন্তু একপক্ষে ভালো। কেননা বেশি ঘাম হয় বলেই গরমে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা কম থাকে। কিন্তু আরবে ঘাম কম হওয়ায় শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে যে কোনো সময়। আর তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিট স্ট্রোক।
শরীরে বিকট গন্ধ
জুতো মোজা খোলা মানেই বাড়ি ভরে যাবে দুর্গন্ধে। গায়ের দুর্গন্ধে পাশে বসা বা দাঁড়ানো দায়। সাবান, ডিওডোরেন্ট, পাউডার কোনো কিছুতেই কাজ হয় না। এই সমস্যার পাকাপাকি সমাধান পেতে হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কিছু অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল ক্রিম ত্বকের ভাঁজে, পায়ের আঙুলের খাঁজে দিনে একবার করে টানা সাতদিন- এভাবে চার মাস লাগাতে হবে। তার সঙ্গে সুতির হাল্কা ঢিলা জামাকাপড় পরতে হবে। তবে মোজাও সুতির হওয়া চাই। মাঝেমধ্যে কাজের অবসরে মোজা খুলে শুকনো নরম কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে পায়ের আঙুলের ভাঁজ মুছে নিতে হবে। বগলও মুছে শুকনো রাখতে হবে।
অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড, অ্যাবসলিউট অ্যালকোহল দ্রবীভূত করে লাগালে ভালো ফল পাওয়া যায়। গরমকালে দিনে দুই- তিনবার গোসল করতে পারলে ভালো হয়। পায়ে বেশি রকমের দুর্গন্ধ হলে সুতির তোয়ালে মোজা পরবেন। প্রতিদিন মোজা বদলে নেবেন। জুতার ভেতর শুকনো রাখতে জুতা রোদে দেবেন।
ঘাম না হলে মৃত্যু হতে পারে
প্রচণ্ড গরমে কোনো কারণে ঘাম বন্ধ হয়ে গেলে হিট স্ট্রোক হতে পারে এবং ঠিক সময়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় এক বিশেষ জন্মগত ত্রুটির জন্য এক্রিন এবং অ্যাপোক্রিন গ্ল্যান্ড অর্থাৎ ঘর্মগ্রনি'র যথাযথ বিকাশ হয় না। বলাই বাহুল্য, এদের ঘাম হয় না। ডাক্তারি পরিভাষায় এ রোগের নাম এক্রোডারমাল ডিসপ্লেশিয়া। এই এক্রোডারমাল ডিসপ্লেশিয়া দুরকম-
(১) অ্যানহাইড্রোটিকঃ এদের একেবারেই ঘাম হয় না, তাই জন্ম মুহূর্ত থেকে রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গেই এদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জায়গায় রাখা জরুরি। না হলে শরীরের তাপমাত্রা সাংঘাতিক রকমের বেড়ে বা কমে গিয়ে মৃত্যু হতে পারে যে কোনো সময়। আসল কথা হলো এতই সাবধানতা মেনে চলা এক প্রকার অসম্ভব বলে এই অ্যানহাইড্রোটিক শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা মুশকিল বিশেষত উষ্ণ আবহাওয়ায়।
(২) হাইড্রোটিকঃ এ ধরনের এক্রোডারমাল ডিসপ্লেশিয়ার রোগীদের ঘাম হয় তবে তা অত্যন- অল্প। তাই এদেরও শরীরের তাপমাত্রার হেরফের হতে পারে যখন-তখন। অবশ্য কিছুটা সাবধানতা মেনে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে খুব একটা অসুবিধা হয় না।
চর্মরোগে ঘাম বন্ধ হতে পারে
ত্বকের কিছু অসুখ যেমন- সোরিয়াসিস, একজিমা, ড্রাগ র‌্যাশ জাতীয় Exfoliate dermatitis যদি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে তখন ঘাম বেরুনোর পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এর ফলে রোগীর শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়ে সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। সে জন্য এ ধরনের ত্বকের সমস্যা দেখা দিলে রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করে যথাযথ চিকিৎসা করা উচিত।
ঘাম ও ঘামাচি
ঘামের সঙ্গে ঘামাচির একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। যাদের বেশি ঘাম হয় এবং যারা যথাযথ পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করেন না এবং উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ থাকতে হয় তাদের একসঙ্গে বেশি ঘাম বেরোতে গিয়ে ঘামাচি হয়। ত্বকের ওপরে থাকা জীবাণু, ধুলো-ময়লা এবং অতিরিক্ত পাউডার বা অন্য প্রসাধনের প্রলেপে ঘাম বেরুনোর পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘামাচি দেখা দেয়।
ঘামাচির প্রকারভেদ
  • ছোট সাদাটে শিশির বিন্দুর মতো ঘামাচির ডাক্তারি নাম মিলোরিয়া ক্রিস্টালিনা। সাধারণত প্রচণ্ড জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে ঘাম নিঃসরণের পথ বন্ধ হয়ে যায়। আর তার ফলেই এ ধরনের ঘামাচি বেরোয়।
  • সাধারণ ঘামাচি মিলেরিয়া রুবরা হওয়ার মূল কারণ একই- ঘাম বেরুনোর পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া, গরমের সময় অতিরিক্ত রোদ, বদ্ধ গরম পরিবেশে বা ভ্যাপসা ঘরে থাকলে, সিন্থেটিক বা মোটা টাইট পোশাক পরলে, অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে এই ঘামাচির প্রবণতা বাড়ে।
  • অনেকের বাড়াবাড়ি রকমের খুব বড় বড় প্রায় ফোড়ার মতো আকারের লালচে ঘামাচি দেখা যায় যা বেশ কষ্টদায়ক। এই ধরনের ঘামাচির ডাক্তারি নাম মিলেরিয়া প্রোফান্ডা।
কী করবেন
  • ঘামাচি নাশক ট্যালকম পাউডার পুরু করে লাগালে ঘামাচি কমার বদলে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা বাড়তি পাউডার ঘুম নিঃসরণের পথ বন্ধ করে দেয় ফলে ঘাম আর জীবাণু মিলেমিশে ঘামাচি কমানোর বদলে বাড়িয়ে তোলে।
  • ঘাম বেশি হলে তা যেন ত্বকের ওপর জমে না থাকে। নরম রুমাল বা তোয়ালে দিয়ে মুছতে হবে বারবার।
  • দিনে দুই-তিনবার গোসল করা দরকার।
  • শরীরে বিভিন্ন ভাঁজে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল লোশন লাগালে ঘামাচির হাত থেকে রেহাই মেলে।
  • অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডারে ভালো ফল পাওয়া যায়।
  • স্নানের পর হালকা করে ট্যালকম পাউডার লাগান।
  • ঠাণ্ডা ঘরে থাকার চেষ্টা করুন, ঘামাচি সেরে যাবে।
  • ঘামাচি খুঁটবেন না, সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
  • বাড়াবাড়ি রকমের ঘামাচি হলে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হবে।
ঘাম এবং অ্যালার্জি
ঘামের জন্য কিছু কিছু অ্যালার্জি এবং কন্ট্যাক্ট ডার্মাটাইটিসের প্রবণতা বেড়ে যায়। শীতকালে কোনো ইমিটেশন জুয়েলারি পরা যায় অনায়াসে। কিন' গরমে এ ধরনের মেটিরিয়াল ঘামের সঙ্গে ত্বকের মধ্যে প্রবেশ করে অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে অনেকের ক্ষেত্রে। কিছুদিন এসব জুয়েলারি পরা বন্ধ রাখতে হয়। তা না হলে ত্বকের সমস্যা বেড়ে যেতে পারে।
কুষ্ঠ ও ঘাম
ঘাম হওয়ার ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করে এক বিশেষ ধরনের নার্ভ। কুষ্ঠরোগে নার্ভ রুট আক্রান্ত হয় বলে কুষ্ঠ আক্রান্ত স্থানে ঘাম হয় না। কিন' শরীরের অন্যান্য অংশে ঘামের পরিমাণ খুব বেড়ে যায়। তাই শরীরের কিছু অংশ ঘামমুক্ত এবং অন্য অংশে প্রচুর ঘাম এ রকম ক্ষেত্রে সোয়েট টেস্ট করে রোগ নির্ণয় করা যেতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস, ঘাম এবং দুর্গন্ধ
অ্যাপোক্রিন ঘাম মানুষের শরীরে গন্ধ সৃষ্টি করে। বাহুমূল ও যৌনাঙ্গে এই অ্যাপোক্রিন ঘামের উৎপত্তি। বংশগত কারণে এবং কখনো যথাযথ পরিচ্ছন্নতার অভাবে কারও কারও শরীরে অত্যন্ত বাজে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। এটি দূর করতে একাধিকবার গোসল ও প্রয়োজনীয় অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল লোশন ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া সুগন্ধি, ডিওডোরেন্ট ও পারফিউম লাগানো যেতে পারে। ট্রাইক্লোসামযুক্ত সাবান ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যায়।
খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে গায়ের গন্ধের একটা সম্পর্ক আছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ঝাল মসলাযুক্ত খাবার, অতিরিক্ত রসুন এবং মাংস খেলে সেই সাথে হজম ক্ষমতা যথাযথ না হলে ঘামে প্রচুর দুর্গন্ধ হয়। প্রতিকার হিসেবে জেন্টামাইসিন, ওসিসোমাইসিন জাতীয় লোশন দিনে দুবার লাগাতে হয়।
অসুবিধা
পরিবেশগত কারণে, কখনো বংশগত কারণে অনেক মানুষেরই অতিরিক্ত ঘাম হয়। ঘাম জমে নানা ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে, আঙুলের ফাঁকে, কুঁচকি ও বাহুমূলে দাদ, ছুলি ইত্যাদি ফাঙ্গাল ইনফেকশনের প্রবণতা বাড়ে। এছাড়া ফোড়া ও কার্বঙ্কলের প্রকোপও বাড়ে। প্রতিকার হিসেবে বারেবারে ঘাম মুছে ফেলতে হবে। তবে বেশি জোরে রগড়ে বা ঘষে মুছবেন না। এতে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ঢিলেঢালা পাতলা ও হাল্কা সুতির পোশাক পরতে হবে। এছাড়া অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল ক্রিম, যেমন মিউপোরোসিন, সোডিয়াম ফিউসেডেট নাকের ফুটোয়, ত্বকের ভাঁজে লাগাতে হবে।
হাত-পায়ের ঘাম কমাতে বোটক্স ইনজেকশন
অনেকের হাত-পা ঘামার প্রবণতা আছে। কোনো কোনো মানুষের হাত-পা ঘামা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে টাইপ করা, লেখালেখি করা, কম্পিউটার চালানো অথবা চটি জুতা পরে হাঁটা মুশকিল হয়ে ওঠে। এ সমস্যার ডাক্তারি নাম হাইপারহাইড্রোসিস। এর প্রতিকার হিসেবে অ্যাবসলিউট অ্যালকোহল অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড দ্রবীভূত করে বারে বারে লাগানো হয়। এছাড়া আয়ানটোফোরোসিস অর্থাৎ কলের পানির আয়ন ইলেকট্রোলিসিসের সাহায্যে বিশ্লেষিত করা হয়। এই পানিতে হাত-পা ডুবিয়ে রাখা হয়।
বোটুনিয়াম টক্সিন বা বোটক্স ইঞ্জেকশন দিয়েও হাত-পায়ের ঘাম কমানো যায়। তবে তিন-চার মাস পরপর ইঞ্জেকশন নিতে হয়। স্থায়ী মুক্তি সম্ভব নয়। দুটি পদ্ধতিই বেশ খরচসাপেক্ষ।
ঘামের জন্য ওষুধ খাবেন না
মানুষ উষ্ণ রক্তের প্রাণী। চারপাশের পরিবেশের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন আমাদের শরীরের তাপমাত্রা একই থাকে। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস শরীরের এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কাজটা করে। ঘাম বেশি মানে শরীরের কোনো সমস্যা হতে পারে। অবশ্য অতিরিক্ত পরিশ্রমেও বেশি ঘাম হয়। কারণ অনুসন্ধান না করে ঘাম কমানোর ওষুধ খেলে টেম্পারেচার প্রোটেকটিভ মেকানিজমটা নষ্ট হয়ে যায়। তাই কোনো মানুষ যদি হঠাৎ বেশি ঘামতে শুরু করে দেখতে হবে পেছনে কী কারণ আছে, যে কোনো বিপজ্জনক ব্যথা যেমন কিডনির ব্যথা, হার্টের ব্যথা, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস থেকে ফুসফুসের অসুবিধা, শ্বাসকষ্ট, অ্যাংজাইটি, স্নায়বিক চাপ ইত্যাদি। শুষ্ক গরমের দেশে ঘাম হয়ে সঙ্গে সঙ্গে উবে যায় বলে মনে হয় ও দেশে ঘাম হয় না। তবে আমাদের আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে প্যাচপ্যাচে ঘাম আপাতদৃষ্টিতে কষ্টকর ও বিরক্তিকর হলেও আমরা অনেক বেশি নিরাপদ। কেননা শুকনো গরমে চট করে ডিহাইড্রেশন ও হিট স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বয়স্ক মানুষ হঠাৎ প্রচণ্ড ঘামতে শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে শুইয়ে দেবেন, লবণ লেবু চিনির শরবত খাওয়াবেন। প্রয়োজন হলে ডাক্তার দেখাবেন। শীতের দেশের মানুষ গরমের দেশে এসে হঠাৎ ঘামতে ঘামতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন মূলত সোডিয়ামের অভাবে। এ ক্ষেত্রেও লবণ-চিনির শরবত দিতে হবে।
টেনশনে ঘাম বাড়ে
ইদানীং বেশির ভাগ সায়কিয়াট্রিস্ট রোগীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে করমর্দন করেন। এর পেছনে উদ্দেশ্য হলো দেখা যে, রোগীর হাত শুকনো না ঘামে ভেজা! কেননা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক বেশি ঘামের পেছনে লুকিয়ে থাকে মনের নানা অসুবিধা। ভয় বা প্যানিক ডিসঅর্ডার, রাগ, উত্তেজনা, উদ্বেগজনিত অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার, এক্সামিনেশন ফোবিয়া ইত্যাদি অতিরিক্ত ঘামের কারণ। আরও দেখা গেছে, টাইপ ‘এ’ পার্সোনালিটির মানুষ যারা অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী, সব সময় কেরিয়ার বা অন্য লক্ষ্যের পেছনে ছুটে চলেছেন তাদেরও ঘাম বেশি হয় অন্যদের তুলনায়। বিশেষ করে যদি হাইপারহাইড্রোসিস অর্থাৎ হাত-পা ঘামার সঙ্গে সঙ্গে হাত অল্প অল্প কাঁপে তা হলে অ্যাংজাইটির ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বা কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কিছুদিন আগে থেকে কিছু কিছু পরীক্ষার্থীর সাংঘাতিক পরিমাণে হাত-পা ঘামতে শুরু করে। অনেকের এমন ঘাম হয় যে কলমে রুমাল বা তোয়ালে জড়িয়ে লিখতে হয়। কোনো ওষুধ নয়, শুধু দুই একটা সিটিংয়ে কাউন্সিলিং, সাইকোথেরাপি আর রিলাক্সেশন এক্সারসাইজ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। আসলে অ্যাংজাইটি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাসলগুলো টেনসড হয়ে য়ায়। ফলে ঘাম আরও বেড়ে যায়। রিলাক্সেশন করলে শরীরের পেশির সঙ্গে সঙ্গে মনটাও হাল্কা হয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কিছুটা কমে। ফলে ঘামও কম হয়। অবশ্য শুধু উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ নয়, রাগ থেকেও হঠাৎ ঘাম হতে পারে। আর রক্তচাপও বেড়ে যেতে পারে হঠাৎ করে। তাই কাজের চাপের মধ্যে কোনো কারণে খুব রাগ হলে চেঁচামেচি না করে ওই অবস্থাতেই চার-পাঁচবার ডিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজ করে নিন। একদিকে উত্তেজনা ও রাগ কিছুটা প্রশমিত হবে এবং অতিরিক্ত ঘেমে গিয়ে শরীরের এনার্জিও নষ্ট হবে না। ভয় পেলেও ঘামের ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায় শরীর বেয়ে। এ প্রসঙ্গে বলি, ঘাম কখনো ঠাণ্ডা হয় না। প্রচণ্ড ভয় পেলে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পায় তাই ঘাম ঠাণ্ডা মনে হয়। যে কারণেই ঘাম হোক না কেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, শরবত পান করা জরুরি।
ঘাম কমাতে শল্য চিকিৎসা
ঘাম কমাতে অপারেশন? ভাবছেন খুব বাড়াবাড়ি? আদৌ তা নয়। যারা ভুক্তভোগী তারাই একমাত্র হাড়ে হাড়ে টের পান কুলকুল করে হাতের তালু, পায়ের তলা, বাহুমূল ঘামার কী ভয়ানক জ্বালা। কোনো কাজই করা যায় না শানি-তে, স্বাভাবিকভাবে। তারা যে কোনো মূল্যে অসহ্য ঘাম কমাতে আগ্রহী। এ প্রসঙ্গে জেনে রাখা ভালো, কমবেশি প্রায় সব দেশের (গরম আবহাওয়ার) এক শতাংশ মানুষ হাইপারহাইড্রোসিসের মতো অতিরিক্ত ঘামের সমস্যায় ভোগেন। এদের প্রায় ২৫ শতাংশেরই বংশগত কারণে এ রোগ হয়। বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই এই সমস্যার সূত্রপাত হয়। এদের মধ্যে হাত ঘামার সমস্যায় কষ্ট পান ২৬ শতাংশ, বাহুমূল ৩৭ শতাংশ এবং দুই জায়গাতেই অতিরিক্ত ঘাম হয় ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে।
এতজন মানুষের অতিরিক্ত হাত-পা ঘামার সমস্যার সমাধানের কিছু সাময়িক ব্যবস্থা আছে। যেমন- ফরমালিন দিয়ে ঘন ঘন হাত ও পায়ের তালু মুছে শুকনো করে দেয়া হয়। কিন্তু সারা দিনে ২-৩ বারের বেশি এ ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়। তাই ইদানীং Thoracoscopic Splanchnicectomy অপারেশনই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বুকের পাশে পাঁজরের পেছন দিক থেকে ছোট তিনটে কি হোল করে নার্ভ কেটে দেয়া হয় যাতে ভবিষ্যতে প্রচণ্ড ঘামের সমস্যায় ভুগতে না হয়।
হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিস রোগে ঘাম বেশি হয়
মোটা মানুষ বেশি ঘামে এ কথা সবারই জানা। আসলে ওজনের বোঝা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে BMR অর্থাৎ বেসাল মেটাবলিক রেট বাড়ে। আর এই বেশি BMR-ই বাড়তি ঘাম হওয়ার অন্যতম কারণ। হাই ব্লাডপ্রেসার ও করোনারি আর্টারি ডিজিজের এক অন্যতম উপসর্গ দরদরিয়ে ঘাম। বুকে ব্যথা নেই কিন' একটা চাপ ধরা ভাব, সঙ্গে নিঃশ্বাসের কষ্ট, আর অন্যদের তুলনায় অনেকটাই বেশি গলগল করা ঘাম-হার্টের অসুখের পূর্বাভাস হতে পারে। বুকে ব্যথার সঙ্গে প্রচণ্ড বেশি ঘাম হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ। এ ক্ষেত্রে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হার্টের চিকিৎসার সুবিধাযুক্ত হাসপাতালে যাওয়া উচিত। হার্টের আর একটি অসুখ লেফট ভেন্ট্রিকিউলার ফেইলিওর হলে ফুসফুসে পানি জমতে পারে। কার্ডিমায়োপ্যাথি নামে এই অসুখে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতে গেলে ঘেমে জামাকাপড় ভিজে যায়। এটাও খুব অ্যালার্মিং সিচুয়েশন।
ব্লাড সুগার বা ডায়াবেটিসের রোগীদেরও ঘাম সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। বিশেষত যারা ইনসুলিননির্ভর। কেননা হঠাৎ রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গেলে অর্থাৎ হাইপোগ্লাইসিমিয়া হলে গলা শুকিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড ঘাম হয়। ডায়াবেটিসের রোগীদের এ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা জরুরি। এ রকম হলে সঙ্গে সঙ্গে গ্লুকোজ বা চিনি মেশানো পানি, নিদেনপক্ষে একটা লজেন্স খেতে হবে।
এছাড়া ভেসোভেগাল অ্যাটাক হওয়ার আগ মুহূর্তে দরদর করে ঘাম হয়। ভেসোভেগাল হলো এমনই একটা সমস্যা যা হঠাৎ করে হতে পারে যে কোনো মানুষেরই। হঠাৎ চারপাশ ঝাপসা হয়ে ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে মানুষটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। শতকরা বিশ জন মানুষের জীবনে অন-ত একবার ভেসোভেগালের অ্যাটাক হয়। অবশ্য অনেকের সাত-আটবার পর্যন্ত ভেসোভেগালের অ্যাটাক হয়। এদের বলে ম্যালিগন্যান্ট ভেসোভেগাল। কোথাও কিছু নেই হঠাৎ দরদর করে ঘাম ভেসোভেগালের পূর্বাভাস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়তে হবে। এছাড়া কুশিং সিনড্রোম বা থাইরো টক্সিকোসিস জাতীয় হরমোনের অসুখে BMR বেড়ে যাওয়ায় প্রচণ্ড বেশি ঘাম হয়। কোনো কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড ঘাম আর স্বাভাবিকের থেকে বেশি হার্টরেট থাকলে কোনো শক বা ইন্টারনাল হ্যামারেজের আশঙ্কা করা হয়। সুতরাং হঠাৎ বেশি ঘামতে শুরু করলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কী খাবেন?
বেশি ঘাম হলে অনেকেই বেশি করে পানি পান করেন। কিন্তু শুধু পানি নয়, লবণ, চিনি ও পাতিলেবু মিশিয়ে শরবত করে খেলে ভালো হয়। কেননা ঘামের সঙ্গে কিছু দূষিত পদার্থ ও তার সঙ্গে যথেষ্ট পরিমাণে সোডিয়াম ও যৎসামান্য পটাশিয়াম ও বাইকার্বোনেট বেরিয়ে যায়। সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ইত্যাদির তারতম্যের জন্য শরীর অত্যন্ত দুর্বল ও অসি'র লাগে। এসব প্রতিরোধ করতে যথাযথ ডায়েটের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ঘাম হলে পানির তেষ্টা পায়, তাই বেশির ভাগ মানুষই প্রচুর পরিমাণে পানি খান। কিন্তু আমরা বলি বেশি করে শরবত খেতে। বেশি ঘাম হলে যা খেতে হবে-
  • সোডিয়ামের ঘাটতি ঠেকাতে সাধারণ লবণই যথেষ্ট, তাই পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে নিন। চিনি লবণের অ্যাবজারবেশনের সাহায্য করে। তাই লবণের সঙ্গে অল্প চিনি মিশিয়ে নিতে পারেন। এ সময়ে লবণ, চিনি ও পাতিলেবুর শরবত খেলে ভালো লাগে। শরীরও সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়ে না। তবে মনে রাখা উচিত ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপের রোগীর লবণ-চিনি খাওয়া মানা।
  • গরমে দইয়ের ঘোল ও ডাব খেতে পারেন। প্রথমত ঘোল ভালো লাগে, দ্বিতীয়ত দইয়ে থাকা র‌্যাকটিক এসিড চটজলদি হজম করাতে সাহায্য করে। ডাবে থাকা পটাশিয়ামও শরীর তরতাজা রাখতে পারে।
  • কাঁচা আমপোড়ার শরবতও শরীর ঠাণ্ডা রাখে।
  • বয়স্ক মানুষদের ঘাম বেশি হলে অবিলম্বে লবণ লেবুর শরবত খাওয়ানো দরকার, না হলে হঠাৎ জ্ঞান হারাতে পারেন।
  • গরমে ঘাম বেশি হয় বলে এ সময়ে সাড়ে তিন থেকে চার লিটার পানি, শরবত ও পাতলা চা খেলে ভালো হয়।
  • যাদের সারাক্ষণ রোদে ঘোরাঘুরি করতে হয় তারা সঙ্গে লবণ, লেবু, চিনি সম্ভব হলে ছাতু মিশিয়ে শরবত করে সঙ্গে রাখুন। শরীর দুর্বল লাগলে ও ঘাম বেশি হলে দু-তিন ঢোঁক করে খেতে পারেন। কাজে এনার্জি পাবেন।
  • তবে গরমকাল বলে পিপাসা লাগুক বা না লাগুক দু-তিন লিটার পানি খেতে হবে তা কিন' নয়, শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের পানি পিপাসা পায়, সেই অনুযায়ী পানি খেতে হবে।
  • লবণ, লেবু ও ছাতুর শরবত শরীর ঠাণ্ডা রাখে।
  • পানি ঢালা ঠাণ্ডা ভাত (পান্তা ভাত) খেলে শরীর ঠাণ্ডা থাকে, ঘুমও ভালো হয়।
  • গরমে ফল বেশি করে খেলে পানির তেষ্টা অনেকটাই কমে। তার সঙ্গে ফলে থাকা ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীর তরতাজা রাখতে সাহায্য করে। জামরুল, তরমুজ, লিচু, শসা, পাকা পেঁপে, পাকা আম যথেষ্ট পরিমাণে খাবেন। পাকা আমের ভিটামিন ‘এ’ ভবিষ্যতের জন্য শরীরে স্টোর করা যায়।
  • কোল্ড ড্রিংসের বদলে টেট্রা প্যাকের জুস ভালো, তবে সবচেয়ে ভালো বাড়িতে তৈরি ফ্রেশ ফ্রুট জুস ও টাটকা ফল।
  • এ সময়ে বেশি তেলমসলা দেয়া মাটন, চিকেন, মাছ না খেয়ে মুরগির স্টু, মাছের পাতলা ঝোল- এই ধরনের খাবার খেলে ভালো হয়।
  • তবে প্রত্যেকের খাবারের রুচি ও সহ্য ক্ষমতা আলাদা আলাদা হওয়ায় গাইডলাইন অনুযায়ী শরীর বুঝে খাওয়াই বাঞ্ছনীয়।
  • মনোজগত প্রতিবেদন

সব জ্বরেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়



কখনো জ্বরে ভোগেনি এমন লোক পাওয়া মুশকিল। তবে জ্বর কোনো অসুখ নয়, অসুখের লক্ষণ মাত্র। আবার গা গরম হওয়া মানেই কিন' জ্বর নয়। সংজ্ঞানুসারে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী মানদণ্ড স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গিয়ে যদি শরীরের তাপমাত্রা ৩৬.৫ সেন্টিগ্রেড-৩৭.৫ সেন্টিগ্রেড (৯৮-১০০ ফারেনহাইট) থেকে বেড়ে যায় তবেই জ্বর বলে ধরে নেয়া হয়। সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা ৯৮.৪ বা ৯৮.৬ ফারেনহাইট থাকে। ১ ফারেনহাইট কম বা বেশিও হতে পারে। আবার দিনের বিভিন্ন সময়েও তাপমাত্রা ১ ফারেনহাইট কমবেশি হতে পারে। এটা স্বাভাবিক। তাপমাত্রা ১০০.৪ ফারেনহাইটের বেশি না হলে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই এবং একে স্বল্পমাত্রার জ্বর বা লো গ্রেড ফিভার বলে। জ্বরকে দেহের প্রোটেক্টিভ মেকানিজম বা প্রতিরক্ষাকারী প্রক্রিয়াও বলে। কারণ কিছু জীবাণু যেমন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস উচ্চতাপমাত্রায় জীবনধারণ করতে পারে না। জ্বর কখনো একা আসে না, কখনো সঙ্গে আনে কাশি, গলা ব্যথা, দুর্বলতা, গা ব্যথা, কাঁপুনি, বমি ভাব ও খাবারে অরুচি ইত্যাদি।
একজন সুস্থ নারী বা পুরুষের স্বাভাবিক তাপমাত্রা হলো
  • মুখে থার্মোমিটার দিয়ে মাপলে ৯২-১০০ ফারেনহাইট
  • রেক্টাম বা পায়ুপথে থার্মোমিটার দিয়ে মাপলে ৯৪-১০০ ফারেনহাইট
  • হাতের নিচে থার্মোমিটার দিয়ে মাপলে ৯৬-৯৯ ফারেনহাইট
বিভিন্ন ধরনের জ্বর
চলমান জ্বর
এ ক্ষেত্রে দিনব্যাপী জ্বর থাকে ও সারা দিনে তাপমাত্রার তারতম্য ১ ফারেনহাইটের বেশি হয় না। (জ্বরে ওষুধ খাওয়ালে অবশ্য কমবেশি হবে) এ ধরনের জ্বরের কারণ লোবার নিউমোনিয়াম টাইফয়েড, প্রস্রাবের ইনফেকশন ইত্যাদি।
নির্দিষ্ট বিরতির পর জ্বর
এ ক্ষেত্রে দিনে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর জ্বর আসে এবং মধ্যবর্তী সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। এ ধরনের জ্বরের কারণ ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, সেপটিসেমিয়া (রক্তে ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন) ইত্যাদি।
রেমিটেন্ট ফিভার
এ ক্ষেত্রে সারা দিনই জ্বর থাকে, তবে তামপাত্রার ওঠানামা ১ ফারেনহাইটের বেশি হয়। জ্বর কখনোই বেড়ে যায় না এবং তাপমাত্রাও একেবারে স্বাভাবিক হয় না। এ ধরনের জ্বরের কারণ ইনফেক্টিভ অ্যানডোকার্ডাইটিস বা হার্টের এক ধরনের ইনফ্লামেশন।
পল অ্যাবস্টেন ফিভার
এটি একটি বিশেষ ধরনের জ্বর, যেখানে এক সপ্তাহ অনেক জ্বর থাকার পর পরবর্তী সপ্তাহে জ্বর একেবারেই থাকে না। আবার পরের সপ্তাহে জ্বর আসে। এ ধরনের জ্বরের কারণ হজকিন্স লিম্ফোমা বা এক ধরনের ক্যান্সার।
প্যারাসিসট্যান্ট ফিভার বা ক্রমাগত জ্বর
ব্যাখ্যাতীত কারণে ক্রমাগত জ্বর যা অজ্ঞাত কারণে শরীরের তাপমাত্রা বাড়া হিসেবে চিকিৎসকরা শনাক্ত করেন। তবে কখনো কখনো জ্বর ছাড়াও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। একে হাইপারথাইমিয়া বলে। যেমন- হিটস্ট্রোক হলে ও কিছু ওষুধ খেলে।
অতিরিক্ত জ্বর
তাপমাত্রা ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের চেয়ে বেশি হলে এটি একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি, অতি দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী মারা যেতে পারে। এ ধরনের জ্বরের কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, সেপসিস, থাইরয়েড স্ট্রম, কাওয়াসাকি সিনড্রম ইত্যাদি।
জ্বরের কারণগুলো
  • ইনফেকশনের কারণে ইনফ্লুয়েঞ্জা, এনকেফালাইটিস, ম্যালেরিয়া, মেনিনজাইটিস, ইনফেকশাস মনোনিউক্লিওসিস গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস।
  • ইনফ্লামেশনের কারণে ফোড়া, অ্যাবসেস হলে।
  • টিস্যু ক্ষতিগ্রস্থ হলে যেমন- অপারেশনের পর, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হিমোলাইটিক ডিজিজ বা রক্তকণিকা ভাঙার অসুখ, কেমোথেরাপি নিলে।
  • রক্ত দেয়ার পর যদি দাতা ও গ্রহীতার রক্তের ক্রস ম্যাচিং বা সঠিক সমন্বয় না হয়।
  • ক্যান্সার-লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ইত্যাদি হলে
  • পালমোনারি এমবোলিজম হলে
  • ডিপ ভেইন থ্রম্বসিস হলে
  • কখনো কিছু মেটাবোলিক অসুস'তায় গাউট হলে
জ্বর হলে কী হয়?
জ্বর শরীরের কোনো অসুবিধার জন্যই হয়। তবে এটি প্রতিরক্ষাকারী প্রক্রিয়া। কারণ জ্বর হলে-
  • উচ্চ তাপমাত্রায় রক্তের শ্বেতকণিকা দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং শরীরে অনুপ্রবিষ্ট জীবাণু ধ্বংস করে।
  • উচ্চ তাপমাত্রায় ফ্যাগোসাইটোসিস বা ক্ষতিকর জীবাণু খেয়ে ফেলার স্বাভাবিক দৈহিক প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়।
  • রোগ প্রতিরোধকারী টি সেলের বিস্তার বেড়ে যায় যা দেহকে প্রতিরক্ষা দেয়।
  • উচ্চ তাপমাত্রায় জীবাণু ও জীবাণু থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর পদার্থকে অকার্যকর করে।
জ্বর সম্পর্কে ভুল ধারণা
  • অনেকেই জ্বরের সময় কিছু খায় না। এতে শরীর দুর্বল হয়ে জীবাণুর বংশবিস্তার দ্রুততর হয়।
  • জ্বরের সময় অনেকে পানি ও জুস খান না এই মনে করে যে এতে ঠাণ্ডা আরও বেড়ে যাবে কিন্তু এটি ঠিক নয়। জ্বরের সময় প্রচুর পানি, ডাবের পানি ও ফলের রস খেতে হবে যেমন- শরীর পানিশূন্যতার শিকার না হয়।
  • জ্বরের সময় অনেকে মাথায় পানি ঢালে। কিন্তু অতিরিক্ত পানি মাথায় ঢালার প্রয়োজন নেই। মাথা ধুলে দ্রুত শুকিয়ে ফেলুন। ভেজা চুল নিউমোনিয়া বা অন্যান্য ফুসফুসজনিত ইনফেকশনের কারণ হতে পারে।
  • ঠাণ্ডা বা বরফশীতল পানি দিয়ে অনেকে গা স্পঞ্জ করে। এটিও ঠিক নয়। স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি দিয়ে গা স্পঞ্জ করে তোয়ালে দিয়ে মুছে শুকিয়ে ফেলতে হবে।
  • অনেকে জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে চান না। কিন্তু জ্বর ১০২ ডিগ্রির বেশি হলে অবশ্যই জ্বরের ওষুধ খাওয়া উচিত। বিশেষ করে শিশুদের। কারণ অন্যথায় তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট উঠে গেলে মসি-ষ্ক ক্ষতিগ্রস- হতে পারে। খিঁচুনি হতে পারে।
জ্বর হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক?
প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধের দোকানে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়, রোগীরাও অ্যান্টিবায়োটিক খেতে শুরু করে দেন জ্বর আসার সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু অধিকাংশ জ্বরের ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নেই বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হতে পারে ক্ষতির কারণ।
  • অ্যান্টিবায়োটিক হলো সেসব ওষুধ যা ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে বা বিস্তার রোধ করে। এটি জ্বর কমায় না। যদি জ্বর ভাইরাসঘটিত হয় সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো প্রয়োজন নেই, কাজও নেই। শ্বাসনালির সমস্যা বা আপার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন যেমন- ফ্লু, কমন কোল্ড বা সর্দিজ্বর, গলাব্যথা ইত্যাদি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাইরাঘগটিত ও ৫-৭ দিনের মধ্যে আপনা থেকেই ভালো হয়ে যায়।
  • কোনো সুনির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনোসিসে পৌঁছার আগেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দিলে প্রকৃত রোগটি অনেক সময় ধরে পড়ে না ও সুচিকিৎসা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়।
  • জ্বর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যান্টিবায়োটিক দিলে বাচ্চাদের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার সুযোগও হয় না। তাই অন্তত দুই দিন না গেলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। মনে রাখবেন মেনিনজাইটিস বা সেপটিসেমিয়া ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে দেরি করে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে কোনো অসুবিধা নেই।
  • যদি জ্বরের সঙ্গে পেট খারাপ থাকে, তবে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক না দিয়ে যেকোনো অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে ইনফেকশন আরও বেড়ে যাবে। সালমোনেলা নামক জীবাণুর ক্ষেত্রে অকার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে রোগী ক্রনিক ক্যারিয়ার বা বাহকে পরিণত হয়। কখনো যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে রোগী মারাত্মক অন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে।
  • কোনো কারণ ছাড়াই ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে শরীরে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স হয়। তাই আন্দাজে অ্যান্টিবায়োটিক না দিয়ে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে দিতে হবে।
  • রোগীরা অনেক সময় ভাবেন দামি অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই দ্রুত রোগ সারবে। দোকানদার বা হাতুড়ে ডাক্তাররা এ সুযোগে প্রচুর দামি অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন। কিন্তু মনে রাখবেন বেশির ভাগ জ্বরে যদি অ্যান্টিবায়োটিক লাগে তা কম দামের পেনিসিলিন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকই যথেষ্ট।
কখন অ্যান্টিবায়োটিক খেতেই হয়?
  • যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা যারা ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রমে আক্রান্ত।
  • যারা ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট (যেমন- ক্যান্সারের ওষুধ, কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করার পর যে ধরনের ওষুধ খেতে হয়) ওষুধ খান।
  • কেমোথেরাপি নিলে।
  • যাদের কোনো কারণে প্লীহা ফেলে দেয়া হয়েছে।
  • বাতজ্বরের রোগী এ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক না খেলে হার্টের ভাল্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
  • জ্বর যদি যক্ষ্মা বা টিবির কারণে হয় মনে রাখবেন অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে দু-এক দিনের মধ্যে অনেক সময়ই জ্বর ভালো হয়ে যায়। কিন্তু জ্বর চলে গেলেই ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় এটাও বিপদের কারণ হতে পারে।
জ্বর যখন ভয়ের কারণ
  • জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি হলে
  • জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে গেলে
  • গায়ে লাল লাল ছোপ বা র‌্যাশ থাকলে
  • শরীরের অন্যান্য গ্ল্যান্ড বা লিম্ফনোড ফুলে গেলে
  • শ্বাসকষ্ট ও কাশি থাকলে
  • মাথায় আঘাতের পর বমি, চোখে ঝাপসা দেখার পাশাপাশি জ্বর থাকলে
  • বারবার জ্বর এলে ও চিকিৎসায় ভালো না হলে
  • জ্বর ও গিঁটেব্যথা থাকলে। এ ক্ষেত্রে বাতজ্বর হতে পারে
  • জ্বর ও খুশখুশে কাশি তিন সপ্তাহের বেশি থাকলে এ ক্ষেত্রে যক্ষ্মা হতে পারে।
  • হার্টের ভাল্বের অপারেশনের পর ক্রমাগত জ্বর থাকলে
  • কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চলমান অবস্থায় জ্বর এলে
  • জ্বরের সঙ্গে পেট ফুলতে থাকলে
  • ক্যাথেটার করা রোগীর জ্বর এলে
  • অপারেশনের পর ঘনঘন জ্বর এলে
  • নবজাতক শিশুর জ্বর থাকলে
  • কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা রোগীর জ্বর এলে
মনে রাখবেন জ্বর বেশি মানেই রোগ বেশি এবং জ্বর কম মানে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই এটা ঠিক নয়। কারণ অনেক সময় অনেক সাধারণ অসুখে অনেক জ্বর থাকে, আবার কোনো কোনো সময় মারাত্মক অসুখেও হালকা জ্বর থাকে।
লেখক : অধ্যাপক
মেডিসিন বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা
ওষুধ যখন বিপদের কারণ
ডা. দিদারুল আহসান
রোগ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা ওষুধ খাই; কিন্তু সেই ওষুধই আবার কখনো কখনো রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে চর্মরোগে। বেশ কিছু চর্মরোগ আছে যার নেপথ্যে মূল ভূমিকায় রয়েছে কোনো না কোনো ওষুধ। অসংখ্য রোগ রয়েছে যা ওষুধের কারণে হয় যার মধ্যে একটি হচ্ছে ফলিয়েটিভ ইরাইথ্রোডার্মা। এই রোগের অন্তত ১১ শতাংশের কারণ হচ্ছে কোনো না কোনো ওষুধ। যে ওষুধগুলোর ব্যবহার থেকে এ রোগ হতে দেখা যায় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সালফার যা কিন্তু অহরহই ব্যবহার করা হচ্ছে। আরও আছে অ্যালুপুরিনল, ফেনিটমেন, ফেনোবারবিটাল, আইসোনায়েড, আয়োডিন ইত্যাদি। এই রোগের ক্ষেত্রে শরীরজুড়ে আঁইশ হতে দেখা যায়, যা ঘষা দিলে ঝরে পড়তে থাকে। শুরুতে লাল লাল দাগ দিয়ে ত্বকে শুরু হলেও ক্রমান্বয়ে তার বিস্তার ঘটতে থাকে এবং পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু দিনের মধ্যেই ত্বক আঁইশ আকারে উঠে আসতে থাকে।
পরবর্তী সময়ে রোগীর অবস্থা খারাপ হয় এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন দেখা দেয় সঠিক চিকিৎসা। না হলে তার জীবন শঙ্কা তৈরি হয়। এমন আরেকটি রোগ হচ্ছে ড্রাগ ইরাপশন। নাম থেকেই বোঝা যায় ড্রাগ বা ওষুধের কারণেই এই রোগটি হয়। এ ক্ষেত্রে ত্বকের গায়ে র‌্যাশ বা চাকা ওঠে, যা দেখলেই মনে হয় যেন হাম উঠেছে কিংবা অ্যালার্জি উঠেছে।
ওষুধের কারণে সাধারণভাবে দুই ধরনের র‌্যাশ হয় যেমন- আর্টিকেরিয়া, যাতে চাকা হয় এবং চুলকানি থাকে। আর এক ধরনের র‌্যাশ হলো মরবিফিলিফর্ম। শেষেরটা বেশি পাওয়া যায় এবং শরীরজুড়ে লাল লাল দাগ অথবা ছোট ছোট দানা বা গোটার আকারে লালচে রঙের হতে দেখা যায়। যেহেতু- ওষুধের কারণেই এই রোগটি হয় তাই এ দরনের র‌্যাশ দেখা দেয়া মাত্র ওষুধ বন্ধ করে দিতে হবে। সাধারণত যেসব ওষুধের কারণে এই রোগ হয় তা হলো অ্যামোক্সাসিলিন, কোট্রামাইসোল, অ্যামপিসিলিন, পেনিসিলিন, সেফালোস্পোরিন, ইরাইথ্রোমাইসিন, সিমেটাডিন ইত্যাদি।
ফিঙ ড্রাগ ইরাপশন নামের আরেকটি রোগে ওষুধ খেলে বারবারই এ রকম উপসর্গ নিয়ে রোগটি দেখা দেয়। যতবার ওষুধটি খাবেন ততবারই ত্বকে এই রোগটি একইভাবে দেখা যাবে। দেখতে গোলাকার ডিম্বাকৃতির লালচে চুলকানিযুক্ত, উঁচু অথবা ফোস্কাযুক্ত যেকোনোভাবে দৃশ্য হতে পারে, যা সেরে যাওয়ার পর স্থানটি কালো রঙের হয়ে থাকে অনেক দিন পর্যন্ত। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ওষুধ যার কারণে রোগটি হয় যেমন- টেট্রাসাইক্লিন, সালফোনামাইড, বারবিচুরেট, স্যালিসাইলেটস ইত্যাদি।
স্টেভাসন জনসনস সিনড্রম নামের আরেকটি রোগও ওষুধের কারণেই হয়। রোগটি অত্যন্ত জটিল এবং এর থেকে জীবননাশও ঘটতে পারে। প্রথমে ফোস্কা আকারে দেখা দেয় যা ঠোট, জিহ্বা, মুখের ভেতরে ঘা হয়ে দেখা দেয়। চোখে আক্রমণ ঘটলে অন্ধত্ব বরণ করতে হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুখ, হাত ও পায়ের তালুতে ফোস্কা নিয়ে উঠতে দেখা যায়। ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে নিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া গিরায় ব্যথা, হৃদযন্ত্রের সমস্যা, যকৃৎ বড় হওয়া এবং রক্তের মধ্যেও ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয় যা চামড়ার ওপর দিয়ে লাল লাল ছোট অথবা বড় দাগ নিয়ে দেখা দেয়, যেটা কখনো কখনো খুবই মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। যদি ঠিক সময় ওষুধ খাওয়া শুরু করা না হয় রোগটির জন্য দায়ী কয়েকটি ওষুধ হলো বারবিচুরেট, কুইনিডিন, ফিনাইলবুটাজোন ইত্যাদি।
একটি কথা মনে রাখতে হবে ওষুধ কিন্তু এক ধরনের বিষ। সাধারণত তা জীবাণুর জন্য বিষ হিসেবে কাজ করে। তবে কখনো কখনো শরীরেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তাই ওষুধ থেকে দূরে নয়, ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখক : চর্ম, অ্যালার্জি ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ
আল-রাজী  হাসপাতাল, ঢাকা
ডা. জিলান মিয়া সরকার
সুনর্গডট ইনফু

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More

 
Design by Free WordPress Themes | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes