Total Pageviews

Showing posts with label ফিচার. Show all posts
Showing posts with label ফিচার. Show all posts

Thursday, July 28, 2011

ভালো খাবার, ভালো স্বাস্থ্য

healthy-foods
কিছু স্বাস্থ্যকর খাবার আছে, যেগুলো সব পুষ্টিবিদের পরামর্শে থাকে। তবুও এমন খাবার রয়ে যায় এদের আড়ালে, যেগুলো খুব পুষ্টিকর হলেও সমাদর নেই এদের, নজরও নেই এদের প্রতি।
খাবার জন্য ভালো ভালো খাদ্য বেছে নেওয়া সহজ কাজ নয়। ছয়টি খাবারের কথা বলি, যেগুলোর সমাদর নেই, তবে খাবারে যোগ করলে খুব পুষ্টিকর হবে বেলার খাবার। ভালো খাবারের নানা সংজ্ঞা।
খাবারটি গোটা খাবার হবে, হোল ফুড। কেবল তাই? খাবার হবে প্রিয়, পরিচিত, সহজলভ্য, পুষ্টিতে ঠাসা, দামেও সস্তা, স্বাদুও হতে হবে। আমরা ব্লু বেবি, বাদাম, স্যামন মাছ—এসবকে সুপার ফুড মনে করি। কিন্তু সমাদর নেই এমন খাবার হতে পারে তারকা খাবার।
১) শিম ও ডালজাতীয় খাবার: মুদির দোকানে গেলে অনেকে এদের কেনেন, আবার কারও কাছে এদের আদর নেই। শিম হলো সুপারস্টার প্রোটিন, আঁশ, জটিল শর্করা, লৌহ, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও দস্তা। সপ্তাহে তিন কাপ শিম খেলে বেশ ভালো। ‘নিউট্রিশন অ্যাট ইওর ফিঙ্গারটিপস’ বইটি লিখে খ্যাত ইলিসাজায়েড বলেন, ডাল ও শুটিসমৃদ্ধ খাবার খেলে ওজন হ্রাস হয়, কমে হূদক্ষতিকর এলডিএল ও বাড়ে এইচডিএল। ভালো স্বাদু খাবার। সবজি সঙ্গে স্যুপ ও স্টু, সালাদে খাওয়া যায় বিনস ও ডাল।
২) তরমুজ: গ্রীষ্মের জনপ্রিয় খাদ্য হলো তরমুজ। প্রাণহরা, তৃষাহরা। মিষ্টি বলে অনেকে ‘চিনি খাবার’ মনে করে খান না। তা নয় কিন্তু। এক্সপেকট দি বেস্ট বই লিখে খ্যাত এলিজাবেথ ওয়ার্ড বলেন, সবার খাবারে থাকবে তরমুজ। খেতে মজা, মিষ্টি, রসাল। লো-ক্যালরি, ভিটামিন এ, সি, পটাশিয়াম ও লাইকোপ্যানে ভরপুর। এতে আছে প্রচুর পানি, তাই শরীরের পানির চাহিদাও পূরণ করে।
৩) মিষ্টি আলু: মিষ্টি আলু মিষ্টি বলে অনেকে মনে করেন হাই-ক্যালরি ও শর্করাভর্তি, তা ঠিক নয় কিন্তু। আমেরিকান ডায়েট অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র হিথার ম্যানগিয়ারি বলেন, ‘মিষ্টি আলু হলো পুষ্টির বিচারে তারকা খাবার, সেরা সবজিগুলোর অন্যতম। এতে আছে প্রচুর বিটাক্যারোটিন, ভিটামিন সি, আঁশ, পটাশিয়াম। সেঁকে, হালকা ভেজে, ভাপে সেদ্ধ করে, সবজি রান্না করে কত ভাবেই না খাওয়া যায় মিষ্টি আলু। আমার স্ত্রী চমৎকার নিরামিষ রাঁধেন এবং তাঁর প্রায় সব সবজি রেসিপিতে থাকে মিষ্টি আলু, আর এটি যোগ করলে খুব স্বাদু হয় নিরামিষ।
৪) লাল বাঁধাকপি: কসিফেরাস সবজির অন্যতম লাল বাঁধাকপিতে আছে প্রচুর আঁশ, ভিটামিন এ, ডি, কে ও ফলেট, অনেক খনিজ এবং এক কাপ বাঁধাকপি কুচিতে রয়েছে মাত্র ২২ ক্যালরি। প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এতে, ক্যানসাররোধী গুণ। খাওয়া যায় কাঁচা, সেদ্ধ, ভাপে সেদ্ধ, রান্না স্যুপে, স্যালাতে, সবজিতে, স্যান্ডউইচে। খাবারও হবে বর্ণিল।
৫) টমেটো।
জর্জিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরেটাস ক্রিস রজেন ব্লুম বলেন, ‘অনেকে বলেন, কাঁচা এবং সেদ্ধ না করে টমেটো ভালো, কিন্তু টমেটো রান্না করলে এ থেকে বেরিয়ে যায় কিছু রোগ প্রতিরোধী লাইকোপ্যান, তাই দেহে এর শোষণ হয় ভালো।
২০০৯ সালে জার্নাল অব অনকোলজিতে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে দেখা যায়, টমেটোসমৃদ্ধ খাবার খেলে রোধ করা যায় প্রোস্টেট ক্যানসার এবং শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট লাইকোপ্যান রোধ করে অন্যান্য ক্যানসারও। টিনজাত টমেটোও কম পুষ্টিকর নয়। তাজা টমেটো আরও ভালো।
৬) সহজ, সরল, চর্বিহীন দুধের দধি
ঘরে পাতা টক দই। সর তুলে নিয়ে চর্বিহীন দুধের দধি। কাঁচা টক দই। দধিতে আছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আমিষ, দস্তা, ভিটামিন বি৬, বি১২, প্রোবায়োটিক কালচার। সজীব জীবাণু। ল্যাকটোজ কম, আমিষ বেশি। কমে কোলস্টেরল, সহজ পাচ্য। স্বাস্থ্যকর।
শুভাগত চৌধুরীর
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, সাম্মানিক অধ্যাপক
ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

Saturday, July 23, 2011

সন্তানের চশমা পরিবর্তনে মা-বাবার করণীয়

children-eye-glasses
দীপা প্রতি পরীক্ষার আগে চোখব্যথা ও মাথাব্যথার উপসর্গে আক্রান্ত হয়। ওর ব্যথার তীব্রতা এতটা বেড়ে যায় যে কিছুতেই পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারে না। পড়া শুরু করায় তেমন কোনো অসুবিধা থাকে না কিন্তু সামান্যক্ষণ পরই তার ব্যথা শুরু হয়। মা-বাবা তাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চোখ পরীক্ষা করেন। বদলিয়ে দেন চশমার পাওয়ার। চশমা বদলের পর কয়েক দিন ভালো থাকে, তারপর আবার একই সমস্যা। মাথাব্যথা, চোখব্যথা। দীপা পড়াশোনায় ভালো। ক্লাসে প্রথম দশজনের ভেতর তার অবস্থান। তবে দিন দিন চোখের পাওয়ার বৃদ্ধি ও চোখের সমস্যায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন দীপার মা-বাবা।
ওপরে দীপাকে নিয়ে যে চিত্রটা তুলে ধরলাম, আমরা প্রতিদিন কমবেশি আমাদের সন্তানদের নিয়ে এ ধরনের সমস্যায় ভুগি। স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি সন্তানের চোখের সমস্যা নিয়ে। কেবল চোখ নয়, বড় ধরনের রোগের আশঙ্কা মাথায় আসে।
চিকিৎসক হিসেবে এ ধরনের রোগী আমরা পাই। এ ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মা-বাবাদের আশ্বস্ত করছি যে আপনার সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের গল্পের দীপাকে নিয়েই আলোচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
আতঙ্কিত মা-বাবা এক চিকিৎসক থেকে আরেক চিকিৎসকের কাছে ছোটেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। কিন্তু তেমন কিছু পাওয়া যায় না। কেবল পরিবর্তন ঘটতে থাকে চোখের চশমার। দীপা তার এক উদাহরণ।
দীপার চোখে পাওয়ারের সমস্যা রয়েছে। তবে তা খুব বেশি মাত্রায় নয়। ওর কিছু অভ্যাস এ সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। আবার দীপার মা-বাবার টেনশন থেকে বারবার চিকিৎসকের চেম্বারে যাওয়ার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে অনেকাংশে দায়ী। দীপা পড়াশোনার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সচেতন। বই চোখের খুব কাছে নিয়ে অধ্যয়নের অভ্যাস তার। পড়ার টেবিল নয়, বিছানায় শুয়েই সে পড়াশোনা করে। এভাবে পড়াশোনা করায় নিজের অজান্তে তার চোখের ওপর বেশি চাপ পড়ে।
আমরা যখন পড়াশোনা করি, তখন আমাদের চোখের বেশ কয়েকটি পেশি একত্রে কাজ করে। বিশেষ করে কাছের দৃষ্টিকর্মের জন্য পেশিগুলো অধিকমাত্রায় ক্রিয়াশীল থাকে। দেখার সামগ্রী যথা বইপত্র যত কাছে নিয়ে পড়ার অভ্যাস করা হয়, তত বেশি চোখের পেশির ওপর চাপ পড়ে। এতে একপর্যায়ে পেশিগুলো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়। ফলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, মাথাব্যথার উপসর্গ দেখা দেয়। কখনো কখনো পেশির খিঁচুনি হয় এবং এ ক্ষেত্রেও উল্লিখিত উপসর্গের উৎপত্তি ঘটে। পেশিগুলো অতিমাত্রায় ক্রিয়াশীল থাকাকালে চোখের অভ্যন্তরের লেন্সের আকৃতির ওপর প্রভাব পড়ে। এতে চোখের অন্তর্নিহিত পাওয়ারের পরিবর্তন ঘটে। চোখের পাওয়ার বিশেষত মাইনাস পাওয়ার এ সময় বেড়ে যায়।
রোগীর দূরের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে। ইদানীং মা-বাবা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে অধিকমাত্রায় সচেতন। তা ছাড়া মা-বাবা ছেলেমেয়েদের স্কুলের লেখাপড়ার বাইরেও বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে থাকেন। স্কুলের পর একাধিক কোচিং সেন্টারে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হন না, বাড়িতেও টিউটর রাখেন। ছেলেমেয়েদের এভাবে পড়াশোনার চাপ দেওয়ায় তাদের চোখ বিশ্রামের সুযোগ পায় না। এর ফলে চোখের পেশিগুলোও বিশ্রাম পায় না। পরীক্ষার্থীরা মা-বাবার কাছে দূরের ঝাপসা দৃষ্টির উপসর্গের কথা বলে। মা-বাবা সন্তানকে নিয়ে ছোটেন চোখের চিকিৎসকের কাছে। চোখের বিশ্রাম না থাকায় ‘অস্বাভাবিক’ চোখের অস্বাভাবিক পাওয়ার পরিবর্তন করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চোখের পূর্ণমাত্রার বিশ্রামের পর যে পাওয়ার থাকে, বিশ্রামহীন চোখের পাওয়ার তা থেকে ভিন্ন হয়। হয়তো যে চোখে কোনো পাওয়ার লাগারই কথা নয়, সেই চোখ বিশ্রামে না থাকায় চোখের ভেতরের পেশির সংকুচিত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাওয়ার ঘাটতির শিকার হয়।
দীপার ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মা-বাবার কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন:
 ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ফাঁকে পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ দিন। একটানা বেশিক্ষণ পড়াশোনা করা ঠিক নয়। ২০ মিনিট পড়াশোনার পর অন্তত পাঁচ মিনিট চোখের বিশ্রাম নেওয়া ভালো।
 সন্তানকে চোখের চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার আগে চোখের বিশ্রাম দিন। যেমন বিকেলে যদি চিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়ার প্রোগ্রাম থাকে, সে ক্ষেত্রে দুপুরের আহারের পর বিশ্রামে থাকতে সাহায্য করুন।
 চোখের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে মোবাইল, কম্পিউটার ব্যবহার ইত্যাদি থেকে বিরত রাখুন।
 কোচিং সেন্টারের শিডিউল ওই দিনের জন্য পরিবর্তন করে নিন। কোচিং সেন্টার থেকে সরাসরি চোখের চিকিৎসকের কাছে যাবেন না। কেননা এ ক্ষেত্রে সন্তানের চোখের পরিমিত বিশ্রাম হয় না।
 আপনার সন্তানকে পর্যাপ্ত আলোয় আরামদায়ক পরিবেশে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করে দিন। লেখাপড়া টেবিলে করা উচিত, বিছানায় শুয়ে নয়। বিশেষ করে যারা চশমা ব্যবহার করে, তাদের জন্য বিছানায় শুয়ে পড়াশোনা করা মোটেও উচিত নয়।
মোটকথা, সন্তানের চোখের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব মা-বাবার। সন্তানকে চোখের পরিচর্যায় যত্নশীল করে তোলায় মা-বাবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।
বাংলাদেশে প্রথম ক্ষুদ্রাকৃতির ইসিজি রেকর্ডার প্রতিস্থাপন
এই প্রথম বাংলাদেশে ক্ষুদ্রাকৃতির ইসিজি রেকর্ডার রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সৈয়দ মো. কায়সারের শরীরে পেনড্রাইভ আকৃতির ইসিজি রেকর্ডার চামড়ার নিচে মাত্র ১৫ মিনিটের স্বল্পকালীন আউট সার্জিক্যাল পদ্ধতির মাধ্যমে মনিটরটি স্থাপন করেন স্কয়ার হাসপাতালের বিশিষ্ট হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল জামিল। এই ইসিজি রেকর্ডারটি তিন বছর পর্যন্ত রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা ইসিজি রেকর্ড করতে থাকবে। যেসব রোগীর অনিয়মিত হূৎস্পন্দন বা ব্যাখ্যাতীত ঘন ঘন মূর্ছা যাওয়ার ইতিহাস আছে, তাদের চিকিৎসা এবং রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই প্রতিস্থাপনযোগ্য ইসিজি রেকর্ডারটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই রেকর্ডারটির ইসিজি রেকর্ড দেখার জন্য বাইরে থেকে একটি বিশেষায়িত যন্ত্রের সাহায্য নিতে হবে। সেই যন্ত্রের সাহায্যে ইসিজি যেকোনো সময় দেখা এবং প্রিন্ট নেওয়া যাবে। যন্ত্রটির নাম REVEAL এবং বিখ্যাত আমেরিকান কোম্পানি VITATRON এবং MEDTRONIC যন্ত্রটি উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশি হূদেরাগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই যন্ত্রটি বাংলাদেশে হূদেরাগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এর আগে এ ধরনের যন্ত্র লাগানোর জন্য রোগীদের উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমাতে হতো। যন্ত্রটি লাগানো থাকা অবস্থায় এমআরআই করার জন্য কোনো সমস্যা হবে না বলে উদ্ভাবক কোম্পানির প্রতিনিধিরা জানান।
মো. শফিকুল ইসলাম
অধ্যাপক, চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

Thursday, July 14, 2011

ফলমূল মাছ-মাংসে রাসায়নিক: হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

chemicals-in-foods
আজকাল বাজারে ফলমূলের দোকানে গেলে মৌমাছি চোখে পড়ে না, মাছের বাজারে নেই মাছের গন্ধ আর মাছির আনাগোনা। এর কারণ কী? উত্তর একটাই—তা হলো, মাছে ফরমালিন মেশানোর ফলে বাজারে মাছের আঁষটে-পচা দুর্গন্ধ আর থাকে না। একইভাবে কোনো ফলমূলের দোকানেও মৌমাছির আনাগোনা নেই বললেই চলে। কারণ, কারবাইড মেশানোর কারণে মৌমাছি আর মধু আহরণ করতে ওই ফলে যায় না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এগুলো বেশিদিন তাজা রাখার উদ্দেশ্যে ফরমালিন, কারবাইড ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে আমাদের দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় দুধ, ফল, মাছ-মাংস এমনকি শাক-সবজিতেও ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকে। এসব কেমিক্যাল একধরনের বিষ, যা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হবে না; কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে।
এমনও শোনা যায় যে অনেক ব্যবসায়ী ফরমালিন পানিতে মিশিয়ে বরফ তৈরি করেন, আর সেই বরফে মাছ-মাংস সংরক্ষণ করেন। বাজারে আম, জাম, কলা, লিচু, পেঁপে—সব কিছুতেই কারবাইড মেশানো হয় এবং অনেক সময় ভেজালবিরোধী অভিযানে এসব ধ্বংসও করা হয়।
ফরমালিন সাধারণত মানুষের লাশসহ মৃত প্রাণীকে তাজা রাখতে ব্যবহার করা হয়। ফরমালিনে ফরমালডিহাইড ছাড়াও মিথানল থাকে, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। লিভার বা যকৃতে মিথানল এনজাইমের উপস্থিতিতে প্রথমে ফরমালডিহাইড এবং পরে ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। দুটোই শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফরমালডিহাইড চোখের রেটিনাকে আক্রান্ত করে রেটিনার কোষ ধ্বংস করে। ফলে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে ফরমালিন, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, কারবাইডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে পেটের পীড়া, হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বদহজম, ডায়রিয়া, আলসার, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগ হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে এসব রাসায়নিক পদার্থ লিভার, কিডনি, হার্ট, ব্রেন—সবকিছুুকে ধ্বংস করে দেয়। লিভার ও কিডনি অকেজো হয়ে যায়। হার্টকে দুর্বল করে দেয়। স্মৃতিশক্তি কমে যায়। শেষ পর্যন্ত ফরমালিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে পাকস্থলী, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ক্যানসার হতে পারে। অস্থিমজ্জা আক্রান্ত হওয়ার ফলে রক্তশূন্যতাসহ অন্যান্য রক্তের রোগ, এমনকি ব্লাড ক্যানসারও হতে পারে। এতে মৃত্যু অনিবার্য। মানবদেহে ফরমালিন ফরমালডিহাইড ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের এসিডিটি বাড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে। ফরমালিন কেবল ভোক্তাদের জন্য নয়, ফরমালিনযুক্ত মাছ বিক্রেতাদের জন্যও ক্ষতিকর।
ফরমালিন ও অন্যান্য কেমিক্যাল সামগ্রী সব বয়সী মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে। ফরমালিনযুক্ত দুধ, মাছ, ফলমূল এবং বিষাক্ত খাবার খেয়ে দিন দিন শিশুদের শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। কিডনি, লিভার ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট, বিকলাঙ্গতা, এমনকি মরণব্যাধি ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে শিশু-কিশোরেরা। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা দিন দিন কমছে। বয়স্ক লোকেরাও এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া গর্ভবতী মেয়েদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা, বাচ্চার জন্মগত দোষত্রুটি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে, প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হতে পারে।
এ ধরনের খাদ্য খেয়ে অনেকে আগের তুলনায় এখন কিডনি, লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগের সমস্যায় ভুগছেন। দেখা যাচ্ছে, কয়েক দিন পরপর একই রোগী ডায়রিয়ায় ভুগছেন, পেটের পীড়া ভালো হচ্ছে না, চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
একবার চিকিৎসা শেষে আবারও তাঁরা একই রোগ নিয়ে হাজির হচ্ছেন। আগে হাসপাতাল-ক্লিনিকে এত রোগী দেখা যেত না। ফল-দুধ-মাছ-মাংসে বিভিন্ন কেমিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব এ অবস্থার অন্যতম কারণ।
এই বিষক্রিয়ার ফল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর হবে ভয়াবহ। আজকের শিশুরাই তো আগামীর ভবিষ্যৎ। ভেজাল খাবার কিংবা বিষাক্ত কেমিক্যাল আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা সাদা চোখে দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে এর খারাপ ফলাফল আমরা পাব। মানুষকে ঘন ঘন হাসপাতালে যেতে হবে। এতে দিন দিন মানুষের চিকিৎসা-ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। শিশুরা কম বুদ্ধিসম্পন্ন হবে, স্মৃতিশক্তি থাকবে না, শরীরে শক্তি থাকবে না, ভারী কোনো কাজ করতে গেলে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। এরাই তো একসময় দেশের নেতৃত্বে আসবে। বিভিন্ন পেশায় কম মেধাসম্পন্ন লোক ভরে যাবে। এদের মধ্যেই কেউ ডাক্তার হবে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হবে, কেউ সচিব হবে, কেউ রাজনীতিবিদ হবে। মোটকথা, একসময় পুরো জাতি মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। দেশ ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
এ থেকে প্রতিকার পেতে হলে সাধারণ মানুষকে বেশি সচেতন হতে হবে। বাজারে ফল-মূল দেখে-শুনে কিনতে হবে। জনগণকে ফরমালিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যালের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানাতে হবে।
সরকারকে আইনের মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসন করতে হবে। ভেজাল ও বিষাক্ত খাবার থেকে নিরাপদ থাকতে ভেজালবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। দেখা যায়, আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় ভেজাল রোধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এমনকি আইনে মাছ, মাংস, ফলমূল ও সবজির ভেজাল পরীক্ষারও কোনো বিধান নেই। যারা খাবারে ভেজাল মেশায়, পরোক্ষভাবে তারা পুরো জাতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ জন্য তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত। সরকার কঠোর হলেই খাবারে ভেজাল দূর করা সম্ভব। খাদ্যে ভেজাল পরীক্ষার জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিতে হবে। প্রতিটি খাবার ভেজাল পরীক্ষা করে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। ভেজালকারীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ফরমালিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল বিক্রি বন্ধ করতে হবে। মাঝে ভেজালবিরোধী অভিযানের সময় খাবারে ভেজাল দেওয়া কিছুটা কমে গিয়েছিল। মানুষও সচেতন হয়েছিল। কিন্তু এখন আবারও খাবারে ভেজালের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।
জনগণের সম্পৃক্ততা, সচেতনতা ও সরকারি উদ্যোগের দৃঢ়তার মাধ্যমেই এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।
এ বি এম আবদুল্লাহ
ডিন, মেডিসিন অনুষদ, অধ্যাপক
মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো

Twitter Delicious Facebook Digg Stumbleupon Favorites More

 
Design by Free WordPress Themes | Bloggerized by Lasantha - Premium Blogger Themes | Facebook Themes